আমার আমিকে চিরদিন

শুক্রবার জানুয়ারি ১৭, ২০২০ ০৯:৫৭

পাতাটি ৭১৪ বার পড়া হয়েছে।

‘আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই’

Cut-কাট, but-বাট, put-পাট? না না পাট নয় – পুট। কেমনে হলো? তা সে যেভাবেই হোক না কেন, আমরা কিন্তু খুব ভালোভাবে শব্দগুলোর যথাযথ উচ্চারণ রপ্ত করেছি

আবার Culture, future, fulfill শব্দত্রয়ে u যথাক্রমে ‘আ’, ‘ইউ’ এবং ‘উ’-এর মতো উচ্চারিত হচ্ছে। শুধু এগুলোতে নয় আরও শত শত শব্দে u-এর উচ্চারণ কখন যে ‘আ’, কখন ‘ইউ’ আর কখন যে ‘উ’ হবে তার কি কোনো রীতি-নীতি/বিধি-বিধান আছে? যদি থাকেওবা আমরা তো সেসব না জেনেই দিব্যি শব্দগুলো শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করছি। future-কে আমরা ফুটুরি বা ফুটুরে বা ফিউটিউরে বলছি না কারণ আমরা কোনো রীতি-নীতি ছাড়াই তার শুদ্ধ উচ্চারণ শিখে নিয়েছি/রপ্ত করেছি। আফিমের প্রভাবে কমলাকান্তের(কমলাকান্তের দপ্তর – বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়) যতই মগজ পরিষ্কার হয়ে যাক কিংবা তিনি দিব্য দৃষ্টি প্রাপ্ত হোন না কেন – উচ্চারণ জানা না থাকলে future-কে তিনিও ফুটুরে নিদেনপক্ষে ফুচার বা ফাচার বলতেন।

শুধু u-কে টানা-হেঁচড়া করছি কেন – a আর e-র উচ্চারণও যে কখন কী হবে তা নির্ণয় করা কমলাকান্তের কাজ নয়, আফিমের মাত্রা চড়িয়েও নয়। দেখুন না a-র উচ্চারণ father-এ ‘আ’, random-এ ‘এ্যা’, radio-তে ‘এ’, call-এ ‘অ’ হচ্ছে। তেমনি e-র উচ্চারণ centre-এ ‘এ’, certificate-এ ‘আ’ আবার meter-এ প্রথমটা ‘ই’ আর পরেরটা ‘আ’ হচ্ছে । এসব রপ্ত করতে আমাদের কেনো রীতি-নীতি লাগেনি!!

তবে সহকারী-তে কেন ‘ঈ-কার’ আর সরকারি-তে কেন ‘ই-কার’ তা জানতে আমাদের ভীষণ মাথাব্যাথা!!

Psychology, Pneumonia, Tsunami-তে P আর T দিগগজ দাঁড়িয়ে কী করছে? কোন্ কার্য সমাধা করছে? আমরা দিব্যি এগুলো শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করছি – P আর T-কে না-দেখার ভান করা শিখতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। আমাদের মনে এ নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। হোক না ল্যাটিন, স্প্যানিশ, জাপানি নানা ভাষা থেকে অনেক শব্দ ধার করেছে ইংরেজি, ধার করা শব্দগুলো অধিকাংশই নিজের মত করে রূপ দিয়েছে, কিন্তু ওপরের শব্দগুলো থেকে P আর T-কে মুক্তি দিচ্ছে না কেন?

আমার তো মনে হয় – সুরঞ্জনার হৃদয় আজ কেন ঘাস(আকাশলীনা – জীবনানন্দ দাশ) তা নিয়ে গবেষণা করা বরং সহজ কিন্তু Often, listen, talk, walk, Wednesday-তে জলজ্যান্ত t, l আর d-কে অস্বীকার করে কিংবা না-দেখার ভান করে কেন অফেন্, লিসেন্, টক, ওয়াক, ওয়েনেসডে বলব তার রহস্য উদঘাটন করা বেজায় কঠিন কাজ। কিন্তু আমরা তা বেশ শিখে নিয়েছি। অথচ বাংলায় ধরন আর ধারণা-তে ন আর ণ ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট কারণ থাকলেও তা জানতে আমাদের ঘোরতর আপত্তি।

Lieutenant-এর উচ্চারণ লেফটেন্যান্ট কেমনে হলো?! শব্দটা পরিচিত না হলে কিংবা উচ্চারণ জানা না থাকলে প্রথম সাক্ষাতে একে লেফটেন্যান্ট উচ্চারণ করার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে না। অবশ্য জুয়েল আইচ-এঁর কথা আলাদা, তিনি হয়ত চোখ সাফাই করে i আর u–কে vanish করে সেখানে একটা f দেখতে পাবেন, আমাদেরকেও দেখিয়ে দিতে পারবেন!!

O-র উচ্চারণ Monday-তে ‘আ’, motion-এ ‘ও’ আর morning-এ ‘অ’ হচ্ছে। কী রহস্য কে জানে!! কখন ‘আ’ হবে, কোথায় ‘অ’ হবে আর কখনবা ‘ও’ হবে তা নিয়ে মাথা খাটানোর চেয়ে বরং গণিত/পরিসংখ্যানের সম্ভাবনা তত্ত্ব বা Possibility Theory/Probability Theory-নিয়ে গবেষণা করাই শ্রেয়। তবুও উচ্চারণগুলো আমরা ভালোভাবে শিখে নিয়েছি, বিরক্তি লাগেনি মোটেই।

`i’-এর উচ্চারণ dirty-তে ‘আ’ কিন্তু direction-এ ‘ই’ আবার crisis-এ ‘আই’ হচ্ছে। তা হোক, আমাদের আপত্তি থাকবে কেন?

এমনি কত শত উল্টা-পাল্টা ব্যাপার-স্যাপার! আপত্তির শেষ কোথায়!!

ইংরেজি ভাষাকে খাটো করে দেখছি না, দেখার সুযোগ নেই। এতসব বৈচিত্র্যের মাঝেই তার uniqueness, তার সৌন্দর্য।

আর মাতৃভাষা বাংলার বেলায়? আমাদের অনেকের কাছে ইংরেজি ভাষা খুব মডার্ন, সহজ, আদর্শ ভাষা, পক্ষান্তরে মাতৃভাষা বাংলা বড্ড জটিল, ব্যাকডেটেড আর বিরক্তিকর।

‘ই’, ‘ঈ’ কিংবা স, শ, ষ বা ন, ণ অথবা ঙ, ং বা ত, ৎ-এর বৈচিত্র্যের মধ্যে বাংলা ভাষার অনন্য সৌন্দর্য আমাদের চোখে ধরা পড়ে না, বিরক্তিই উদ্রেক করে শুধু।

ভবিষ্যতের কোনো এক সন্ধিক্ষণে, কোনো crisis moment-এ মাতৃভাষা বাংলার প্রতি দরদ, মমত্ববোধ, শ্রদ্ধা আরও জেগে উঠবে আমাদের মনে – এই স্বপ্নের অঞ্জন দুনয়নে মেখে ঘুমাতে বেশ লাগে আমার। আপাতত তাই করি।

মতামত জানান