আলমগীর বাদশার মৃত্যু

বৃহস্পতিবার জানুয়ারি ৯, ২০২০ ০১:৪৪

পাতাটি ৯৭৭ বার পড়া হয়েছে।

আলমগীর বাদশা মারা গিয়েছে৷

অনেকদিন আগের কথা, তেতুঁলতলার পুকুরঘাটের তালের গুড়ির নিচে তার লাশ পাওয়া গিয়েছিল৷ গ্রামময় রাষ্ট্র হয়েছিল, দুষ্ট জীন তাকে মেরে পানিতে ফেলে দিয়েছে৷

এ কাহিনী এখন আর কারো মনে থাকার কথা নয়, পুত্র শোক ভুলে গিয়েছে আলমগীর বাদশার মা ফতি বেগম৷ মাঝে মাঝে তার মনে পড়ে আলমগীরের লাশ যখন পানি থেকে তুলে আনা হয়েছিল, তার গলার দুপাশে মোটা দুটি আঙুলের চাপ ছিল, গর্দানের দুপাশে ছিল আটটি নখের দাগ৷ তাকে হত্যা করা হয়েছে, এই কথা সকলেই বিশ্বাস করেছে, কোন মানুষ এমন নিষ্পাপ শিশুকে মেরে পানিতে ফেলে দিতে পারে এই কথা কেউ বিশ্বাস করলো না৷ বয়স্করা বলাবলি করতে লাগলেন, তেতুঁল গাছে দুষ্ট জীনেরা থাকে, এটা তাদেরই কাজ৷

বাবা শহরে থাকেন, গ্রামের স্কুলে আমার পড়াশোনা হবে না বলে আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে এলেন৷ ভালো একটা স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে আমাকে৷ থাকি বাবার সাথে৷ তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি৷ আলমগীর আর আমি একসাথে পড়তাম, সে ছিল আমার মাস ছয়েকের বড়৷ ক্লাস ফাইভের ফাইনাল পরীক্ষার পরে সে মারা গিয়েছিল৷

আমার মনে আছে, সে ভালো সাঁতার জানতো আর তার সাহসও ছিল বলিহারী৷ সাপের ভয়ে আমরা জোড়পুকুরের পানিতে পা ডুবাতাম না, অথচ সে নির্ভয়ে লাল শালুকের ফুল তুলে আনতো মাঝ পুকুর থেকে৷ তার গায়ে ধরে থাকতো বড় বড় জোঁক৷ সে হাতে থু থু নিয়ে অথবা প্যান্টের পকেট থেকে লবণ বের করে জোঁকের মুখে দিত, আর হাসিতে ফেটে পড়ে বলতো, শালারা আমার রক্ত খেয়ে পার পাবি না৷

তখন বন্ধুত্ব বোঝার বয়স আমার হয়নি, কিন্তু আজ আমার মনে হয় আলমগীর মরেনি৷ সে আমার হৃদয়ে বেঁচে আছে৷

বাবা বৃদ্ধ হয়ে অবসর নিয়েছেন৷ এখন তিনি গ্রামের নিয়মিত বাসিন্দা৷ পাঁচওয়াক্ত নামায পড়েন আর ঘরে ফিরে পেনশনের টাকায় কেনা বই পড়েন, এরমধ্যে জান্নাত লাভের সহীহ পথ টাইপের বইই বেশি৷ মাঝে মাঝে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও তাঁকে দেখা যায়৷

আমি শহরে থাকি, গ্রামে আসি মা-বাবার সাথে সাক্ষাৎ করতে৷

তেতুঁলতলা পুকুরের পাড়ে এখন আর তেতুঁল গাছ নেই, সেখানে সাউদী আরবের অর্থায়ণে সুরৌম্য এক মসজিদ হয়েছে৷ লোকজনের যাতায়াত বেড়েছে৷ তালেরগুড়ি দিয়ে বাঁধানো ঘাটের স্থলে এখন পাকা শান বাঁধানো ঘাট৷ মসজিদের খানিক দূরে চা-মুদির দোকান খুলেছেন ফরিদ চাচা৷ পথের ধারে হওয়ায় কারণে অকারণে তার দোকানের সামনে দিয়ে যেতে হয়৷ তিনিও ডেকে নিয়ে চা সাধাসাধি করেন৷

যতবার তার দোকানে গিয়েছি, প্রায় দেখেছি তিনি আলমগীর বাদশার মৃত্যুর ঘটনা বলেন, ‘আহ! কত ভালো ছেলে ছিল’ বলে মন খারাপ করতেন৷ কখনো কখনো তার চোখের কোন আর্দ্র হয়ে উঠতো৷

মাগরিবের নামাযের ওযু করতে গিয়ে আঙুল দেখিয়ে বলতেন, এই তো এখানেই আলমগীর বাদশার লাশ পাওয়া গিয়েছিল৷

আলমগীর ফরিদ চাচার কেউ নন, সে মারা গেছে বছর ত্রিশ আগে, এতোদিন তার কথা মনে রাখার কোন কারণও ছিল না৷ কিন্তু ফরিদ চাচা তাকে ভুলেননি কেন এই প্রশ্ন আমার মনে আসতো কখনো সখনো৷ অবশ্য তাকে কখনো বলিনি৷

ত্রিশ বছর পর আলমগীর বাদশা নানান প্রশ্নে বিদ্ধ করছে আমাকে, এসব প্রশ্নের আগামাথা নেই৷ সে যেন বলছে, জানিস, একটা অপমৃত্যু মামলা হতে পারতো, আমার মা অনেকদিন ধরে কাঁদতে পারতো, বাবা চুপ করে না গেলেই হতো৷

গ্রীষ্মের শেষে গরমটা বিশ্রি রকমের বেশি হয়৷ দক্ষিণের জানালা খুলে শুয়ে আছি ছাদের ছোট ঘরটায়৷ বাবার লাগানো নারিকেল গাছটা জানালা পেরিয়ে হাত দুয়েক উপরে উঠেছে৷ নারিকেলের পাতায় চাঁদের আলো খেলা করে, আমার দেখে ভালো লাগে৷

আমার চোখে ঘুম লেগেছে, কান জেগে আছে, কে যেন ডেকে বললো, বাহিরে মনোহারী চাঁদের আলো আর তুই রয়ে গেলি অন্ধকারে! হুড়মুড় করে উঠে বসলাম৷ জানলায় তাকিয়ে দেখি মা দাঁড়িয়ে আছেন, বললেন, দেখতে এলাম জেগে আছিস কিনা?

বললাম, তুমি কি আমায় ডেকেছিলে, কিছু বলেছিলে?

মা বললেন, দেখলাম ঘুমিয়ে পড়েছিস তাই ডাকিনি!

— তাহলে কে বললো আমি অন্ধকারে পড়ে আছি, আমার ঘরে তো চাঁদের আলো খেলছে৷

মা হেসে বললেন, বাহিরে আয়, মা বেটায় গল্প করি৷

একথা সেকথার পর বললাম, মা, আলমগীর বাদশাকে মনে পড়ে তোমার৷

মা আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন৷ আমি তাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি৷ সেদিন তুমি মাংস রান্না করেছিলে, তখন আমাদের এই রকম দোতলা বাড়ি ছিল না৷ ঘরে বাথরুম ছিল না, তুমি পুকুরে গোসল করতে যেতে৷ তুমি বলেছিলে, ক্ষুধা লাগলে খেয়ে নিস, আমার ফিরতে দেরী হবে৷ তুমি পুকুর ঘাটে গিয়েছিলে আরিফকে নিয়ে, তার শরীরে জলের গাদ পড়েছে, ঘষে গোসল করাতে হবে৷ আমি খেতে বসেছিলাম, তখন আলমগীর বাদশা দুটি কাকের ছানা নিয়ে আমাকে ডেকেছিল৷ আমি তাকে ঘরে বসতে বললে, সে বলেছিল, দেখে যা কী নিয়ে এসেছি৷

আমি ভাতের থালা হাতে করেই বেরিয়ে এসে দেখি কুচকুচে দুটি কাকের ছানা তার হাতে৷ সে বললো, জলিল মিয়ার তাল গাছ থেকে পেড়ে এনেছি৷ খুব সুন্দর না৷ আমি তার সামনে বসে মাংস দিয়ে ভাত খেয়েছি, সে ছানা দুটি নিয়ে তার পরিকল্পনা বলছিল৷ সে একটা বাঁশ নিয়ে আসবে তোমার কাছে, তুমি তাকে খাচা বানিয়ে দিবে৷

রাতে তুমি জিজ্ঞেস করলো, আলমগীর কী নিয়ে এলোরে?

— দুটো কাকের ছানা৷ আগামীকাল বাঁশ নিয়ে আসবে, একটা খাঁচা বানিয়ে দিও৷

— তাকে খেতে বলিস নি?

— না৷

— তুই তো দিন দিন ছোট লোক হয়ে যাচ্ছিস৷

— সে তো কাক নিয়ে খেলছিল৷ কাককে নাকি সে কথা শেখাবে!

রাতে আলমগীরের কাকের ছানা দুটি বিড়ালে খেয়েছিল৷ সে অনেক কেঁদেছিল৷ আমার খুব ইচ্ছে ছিল, আবার যখন মাংস রাঁধবে তাকে ডেকে নিয়ে আসবো৷

কাকের ছানাকে কথা শেখানো হয়নি আলমগীরের, মাংস রান্না করে দাওয়াত করে খাওয়াতে পারিনি তাকে৷ মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন৷ আমি জানি, মা হয়তো কাঁদছেন, আমি তার মুখের দিকে তাকাতে পারিনি৷

ফরজের নামাযের পর মসজিদে বসে কুরআন তেলাওয়াত করছিলেন ফরিদ চাচা, আমি তার পাশে গিয়ে বসলাম৷ তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কিছু বলবে?

— হ্যাঁ৷

তিনি কুরআন শরীফ তুলে রেখে বাহিরে আসলেন, মসজিদে দুনিয়াবী কথা বলা নিষেধ৷ আমরা পুকুরঘাটে গিয়ে বসলাম৷ জিজ্ঞাসা করলাম, আলমগীরের লাশ তো পানি থেকে আপনিই তুলেছিলেন?

তিনি বললেন, হ্যাঁ৷

সে তো সাঁতার জানতো৷

তাকে পাওয়া গেছে তালের গুড়ির নিচে, কাঁদা চাপা দেওয়া ছিল৷

আপনি কি জানতেন, লাশ এখানেই ছিল?

আমার প্রশ্ন শুনে তিনি চমকে উঠলেন৷ পরে সামলে নিয়ে বললেন, না, আমি জানতাম না৷ আমি মাঠে ছিলাম৷ মাগরিবের আযানের আগে গোরু নিয়ে ফিরেছি৷ এসে শুনলাম, আলমগীর বাদশাকে পাওয়া যাচ্ছে না৷ ভাবলাম, সে কোথাও হয়তো গিয়েছে৷ ছেলে ধরায় নেওয়ার মতো বয়স তো তার ছিল না৷ তাই তেমন গুরুত্ব দেইনি৷ গোয়ালে গোরু বেঁধে আমি মাগরিবের ওযু করতে এই ঘাটে এলাম৷ তোমার মনে আছে কিনা জানি না, তখন এই ঘাট পাকা ছিল না৷ তাল গাছের টুকরো ধাপে ধাপে সাজিয়ে ঘাট বাঁধানো হয়েছিল৷ তখনো দিনের আলো নিভে যায় নি, সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে৷

আমি ওযু করতে বসে লক্ষ্য করলাম বড় একটা কচ্ছপ কী জানি কামড়ে টানাটানি করছে৷ আমি তামশা দেখতে লাগলাম৷ হঠাৎ মনে হলো মানুষের মতো৷ বুকের ভেতর কেমন করে উঠলো, আলমগীর নয় তো? ঝাঁপিয়ে পড়লাম পানিতে, কোলে করে তুলে আনলাম উপরে৷ তখন আলমগীরের ফুফাতো ভাই কাশেম কোথা হতে দৌঁড়ে এসে ভাইরে বলে আমার কাছ থেকে তাকে নিয়ে গিয়েছিল৷

আমি ভাবছি, ছোট ছিলাম বলে আলমগীরের লাশ দেখতে দেয়নি আমাকে৷ ক্ষণেক চুপ করে থেকে বললাম, সে তো সাঁতার জানতো, পানিতে ডুবে তো তার মরার কথা নয়?

— সবাই বলে তেঁতুল গাছের দুষ্ট জীনে তাকে মেরেছে৷

— আপনি কি এই কথা বিশ্বাস করেন?

তিনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন৷ ক্ষণেক পরে বললেন, চলো আমার দোকানে নাস্তা করবে আজ৷ মধু ছেলেটা ভালো পরোটা ভাজে৷

আমার নাস্তা করতে ইচ্ছে করছিল না৷ তবু তার সাথে গেলাম৷ আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে, ফরিদ চাচা আলমগীরের মৃত্যু রহস্য জানেন৷

এই ফাঁকে বেশ কিছুদিন কেটেছে৷ আলমগীর বাদশার কথা আবারও ভুলে গেছি৷ মনে হলো, ত্রিশ বছর আগে যে চলে গেছে তাকে নিয়ে সময় নষ্ট করা বা অযথা হৈচৈ করা কোন কাজের কথা নয়৷

কিন্তু ইচ্ছে করলেই সব ভুলে যাওয়া যায় না৷ অথবা ভুলে যাওয়া কথাটাও কখনো মনের মাঝে এমনভাবে জেগে উঠে তাকে আর মন থেকে সরানো যায় না৷

আজ সকালে আমি ঢাকায় চলে যাবো বলে স্থির করেছিলাম৷ মা বললেন, আর দুটো দিন থেকে যা, তোর বড় ফুফু আসবে কাল দেখা করে যাস৷
আমি বললাম, তাহলে ছোট ফুফুকেও ফোন করে দাও দুজনেই আসুক৷

দুপুরে খাওয়ার পর একটু বিশ্রাম নিতে হয়৷ মা বলেন, দুপুরের খাওয়ার পর একটু ঘুমালে নাকি শরীর ভালো থাকে৷ কিন্তু দিনে ঘুমানো আমার পছন্দ নয়৷ এই জন্য একটা বই নিয়ে শুয়ে শুয়ে পড়তে লাগলাম৷

একটা মেয়ে এসেছে৷ মেয়েদের বয়স অনুমান করা আমার সাধ্য নয়, তাই এই নিয়ে ভাবিও না৷ তবে মেয়েটি রূপবতী৷ সে বললো, ভাইয়া আপনাকে একটু বিরক্ত করবো৷

— বেশি জরুরী?

— না, তেমন নয়৷ বাবা অসুস্থ, আপনাকে দেখা করতে বলেছেন৷

— তোমার বাবার নাম কী?

— আমাকে চিনেন না, আমি আপনার ফরিদ চাচার মেয়ে৷

আমি লজ্জা পেলাম৷ ফরিদ চাচার মেয়েকে না চেনার কথা তো নয়, চিনবোই বা কী করে, আমি তো গ্রামেই থাকি না৷

মাগরিবের পরে ফরিদ চাচার সাথে দেখা করতে গেলাম৷ তিনি খুবই অসুস্থ, তারপরও উঠে বসলেন৷ বললেন, কখন মরে যাই তার ঠিক ঠিকানা নেই৷ কথাটা তোমাকে বলেই যাই৷ মনুষ্য বসতির ভেতর জীন থাকে না৷ হাদিস শরীফে আছে জীনেরা থাকে বিরান ভূমিতে৷ তারপরও মাঝে মধ্য দুএকটা এসে পড়ে জনবসতিতে৷
ফরিদ চাচার মেয়ে চা দিয়ে গেলেন, আমরা দুজনে চা পান করছি৷ ফরিদ চাচা বলে চলেছেন, আলমগীরের লাশ আমিই গোসল দিয়েছি৷ তার শরীর হতে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছিল৷ এটা জীনের কাজ নয়, কোন মানুষই এমন কাজ করেছে৷

আমি হতবাক হয়ে চাচার কথা শুনতে লাগলাম৷ তিনি বলছেন, আলমগীরের মত্যু রহস্য আমি জানি না৷ তবে আমার ধারনা ঘটনা তাদের নিজের লোকেই করেছে৷

আলমগীরের বাবা গফুর অনেক সম্পত্তি নষ্ট করেছে, পিতৃ সম্পত্তির যা অবশিষ্ঠ ছিল বন্টন হলে তার ভাই আর বোনেই সব নিয়ে যেতো৷ আলমগীরের মৃত্যুর পর গফুরের বোন তার অংশ গফুরকে লিখে দিয়েছিল৷ বাবা, তুমি বুঝবে, ত্রিশ বছর আগে হলেও লাখ টাকার সম্পত্তি কেউ কাউকে এমনি লিখে দেয় না৷

গফুর চাচার কথা শুনে আমি স্থির থাকতে পারলাম না, মাথা কেমন ঘুরতে লাগলো৷ আমি তার ঘর থেকে বের হয়ে চলে এলাম৷ তার প্রতি প্রচণ্ড রাগ হলো আমার, সব বুঝেও তিনি চুপ করে রইলেন কেন?

ঢাকায় ফেরার পর একদিন আমার নাম্বারে একটা কল এলো, লোকটা তার পরিচয় বলেনি৷ সে একটানা কথা বলে গেলো, আমাকে কিছু বলার সুযোগও দেয়নি৷ তার কথা হচ্ছে, অযথা ত্রিশ বছর আগের একটা ঘটনা নিয়ে মাথা গামানোর প্রয়োজন নেই৷ বেশি ঝামেলা করলে আমাকে আর গফুর চাচাকেই ফাঁসানো হবে৷

আমার মোবাইলে কল রেকর্ডিং চালু ছিল৷ আমি নাম্বারটি ফেসবুকে সার্চ দিয়ে একটা প্রোফাইল খুঁজে পেলাম৷ লোকটার নাম কাশেম খান৷

মতামত জানান