ভালো থেকো (পর্ব-১২)

শনিবার মার্চ ১৪, ২০২০ ০৪:০২

পাতাটি ২২১ বার পড়া হয়েছে।

১১ম পাতার পর…..

বিকালের ঘুম। আরামছে ঘুম আসছে। সম্ভবত স্বপ্ন দেখার পালা। যে ঘুমে স্বপ্ন দেখা হবে, সে ঘুম শুরু থেকেই আরামদায়ক হবে। ঘুমের স্বপ্নযাত্রা শুরু হলো। পুরো ঘরময় আলোকিত হয়ে উঠলো। এ সাধারণ কোন আলো নয়, শিউলীর রূপের ঝলকানি। আকাশী রঙের হাফ হাতা লম্বা কামিজ, আর মাথায় সাদা ওড়না। কিছু চুল মুখের এক পাশ বেয়ে সম্মুখদিকে বেঁকে এসেছে। মুখে স্ফিত হাসি। ডাগর চোখের দুষ্টু দুষ্টু চাহনী। সর্বাঙ্গ থেকে জ্যোতি ছড়িয়ে ঘরের সবকিছু ডিম লাইটের আলোর মত দেখাচ্ছে। এগিয়ে আসছে আমার দিকে। বুকের কাছে এসে অনেকখানি ঝুঁকে পড়ে এক হাত আমার বুকের উপর রেখে অন্য হাতে চুলে ডোরা কেটে মৃদু স্বরে বলে উঠলো

এই দুষ্টু কি ভাবছো আমাকে নিয়ে?
আমি যেন তার নিঃশ্বাস এবং মুখের সুগন্ধও অনুভব করছি।
বললাম – কই কিছু ভাবছিনা নাতো।
শিউলী – আমাকে ফাঁকি দেয়া হচ্ছে? আমি সব বুঝি।

আমি – তাহলে এটাও বুঝে নাও আমি তোমাকে নিয়ে কি ভাবছি?
শিউলী – তুমি আমাকে খুব ভালোবাস তাইনা?
আমি – হুম, খুব ভালোবাসি। তোমাকে কাছে রাখতে চাই। পোষা ময়নার মতো আদর করতে চাই।
শিউলী – সেটা আর সম্ভব হচ্ছেনা। তুমি চাইলেও আমি তোমার হচ্ছিনা। এই দেখ আমার হাতে একটা আংটি দেখছো? এটা আংটি নয়, তোমার আমার মাঝে মস্তবড় এক দেয়াল।
আমি – খুলে ফেল ওটা। ভেঙ্গে ফেল এ দেয়াল।
শিউলী – তা সম্ভব নয়। আজ আমি চলে যাচ্ছি। তোমার সমস্ত আশা ভরসার এখানেই ইতি টানো।

আমি – তাহলে এখনি আমাকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেল। তোমাকে হারানোর বেদনা আমি সইতে পারবোনা। আমি শিউলীর হাত ধরতে চাইছি। কিন্তু ততক্ষণে সে নেই। কই গেলে? শিউলী, এই শিউলী।
ঘুম ভেঙ্গে গেল। মনটা বিষন্নতায় ছেয়ে গেলো। এ আমি কি দেখলাম। বিকালে অবসন্নতা আসায় ঘুমিয়ে পড়েছি। টানা ঘুমে সন্ধ্যা ৭টা। এত দীর্ঘ ঘুম অসময়ে আর কখনো হয়নি আমার। উঠে ফ্রেশ হয়ে জামাÑপ্যান্ট পরে দ্রুত রওনা দিলাম। স্বর্ণকারের কাছে যে আংটিটা বানাতে দিয়েছি সেটা এখনি নিয়ে আসবো। কালই এ্যাঙ্গেজমেন্ট করবো। শিউলীকে হারাতে দেবোনা।

মনির ভাইয়ের কম্পিউটার সেন্টারের সামনে দিয়ে যাচ্ছি। উনি হঠাৎ ডাক দিয়ে একটা কাজ ধরিয়ে দিলেন। বললাম ভাইয়া আমার খুব তাড়া, একটু পরে করবো। উনিও নাচোড়বান্দা। কাজটা যথাসময়ে দিতে না পারলে ইজ্জত থাকবেনা। ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাই বসতে বাধ্য হলাম।

কম্পিউটারে কাজ করে যাচ্ছি। এমন সময় বন্ধু শিমুল এর কল। রিসিভ করলাম।
শিমুল – কিরে বন্ধু তুই কই?
আমি – আছি, কম্পিউটার সেন্টারে।
শিমুল – তোরে একটা খবর দিতে ফোন করেছি।
আমি – (কানের সাথে মোবাইলকে বাহু দিয়ে চেপে ধরে টাইপ করে চলছি) হুম, বল শুনছি।
শিমুল – শিউলীর বিয়ে হয়ে গেছে।

আমার হাত থেকে তখনি মোবাইলটা ফ্লোরে পড়ে তছনছ হয়ে গেছে। মনির ভাই চমকে উঠলেন। মোবাইলের পার্টসগুলো জড়ো করছেন। আমার শরীর অবসন্ন। চারদিক ঘুরছে। চোখ রিমঝিম করছে। তারপর কিছুক্ষণ কোন খবর ছিলনা। চোখেমুখে পানির ছিটা পড়ায় সম্বিত ফিরে পেলাম। ততক্ষণে ছোটখাটো জটলা বেঁধে গেল, হইচই পড়ে গেল। কি হয়েছে তোমার? সবার আতঙ্কিত জিজ্ঞাসা। এমন এক বিষয় না পারি কইতে, না পারি সইতে।

মনির ভাই বললেন- ভাই যাও, রেস্ট নাও। শরীর খারাপ হলে রেস্ট নেওয়া ভালো হবে। আমিও ছাড়া পেয়ে নির্জন জায়গায় চলে গেলাম। সমস্ত আবেগ ঢেলে দিয়ে কিছুক্ষণ ইচ্ছেমত কাঁদলাম। তারপর শিমুলকে ফোন দিলাম।
ও প্রান্ত থেকে হ্যালো, কিরে, ফোন কেটে গেল কেন?
বললাম – চার্জ শেষ হয়ে গেছিল। এখন চার্জ দিয়েছি। এই শিমুল তুই যেটা বলেছিস এটা সত্য নাকি ঠাট্টা?

শিমুল – এই ব্যাটা, বোনেরে নিয়া কেউ ঠাট্টা করে?
আমি – তো আমারে এখন কেন বললি? আগে বললে কি সমস্যা হতো?
শিমুল – দোস্ত তুই মনে কষ্ট পাবি এটা আমি জানি। তবে বিশ্বাস কর আমাদেরকে ওরা মোটেও সময় দেয়নি। হুলস্থুল করে এলাকার মাতব্বরকে দিয়ে এক প্রকার জিম্মী করে বিয়ের কাজ সেরছে ওরা।

কষ্ট সইতে পারছিনা কোনমতে। আচ্ছা লোকে বলতে শুনেছি ধূমপান নাকি টেনশন কমানোর একটা উপায়? একটা সিগারেট টানা যায়। হয়তো কষ্ট কিছুটা লাঘব হবে। দোকানদারকে বললাম একটা সিগারেট দাও।
দোকানদার বলল – কি সিগারেট?
-ওই শালা, নাম বলতে পারবোনা, ভালো একটা সিগারেট দে।
দোকানদার একটু হেসে দিয়ে বললো সিগারেটও আবার ভালো হয় নাকি?

আমার রাগে মাথায় রক্ত উঠে যাচ্ছে। সবসময় ইয়ার্কি ভালো লাগেনা সোহাইগ্যা। সিগারেট দামীটা দে।
একটা দিল এবার। ধরিয়ে টান দিলাম। খুক খুক করে কাশি এসে গেল। ওহ্ মনে হয় কলিজা ছিঁড়ে গেছে। কিছু মানুষ এ জিনিস হরদম হজম করে কিভাবে? মনে হয় প্রথম প্রথম এমন লাগলেও পরে ফিট হয়ে যাবে। তাই কষ্ট করে টানতে আছি। কিছুক্ষণের মধ্যে শেষ। মাথা একটু ঘুরাচ্ছে বটে তবে ভালো লেগেছে।

বললাম – এগুলো এক প্যাকেটে কয়টা থাকেরে?
– বিশ টা স্যার। সোহাগের কাঁপা জবাব। মনে হয় ছেলেটা এবার বুঝতে পেরেছে আমার অবস্থা।
আমি – দে তো এক প্যাকেট, সাথে একটা লাইটারও দে। দিতে দেরী হচ্ছে কেন? আমার হুংকার।
– দিচ্ছি স্যার এই নেন।

সিগারেট নিয়ে চলে এলাম ডরমেটরিতে। সারারাত একের পর এক সিগারেট টানলাম আর চোখের পানি ছাড়তে লাগলাম। কখনো বড় বড় হিচকি এসে যায়। কেউ শুনতে পারে ভেবে মুখে বালিশ চাপা দিয়ে আওয়াজ লুকাই। আমার স্বপ্নগুলো ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল।
সবকিছু নিমেষেই ওলট পালট হয়ে গেল। একদিন আগেও যেটা কল্পনা করিনি, সেটাই ঘটে গেল আমার সাথে। বিধাতার হেঁয়ালিপনায় আকষ্মিক বদলে গেল আমার পৃথিবী। আজকাল প্রভাব খাটিয়ে যেন অনেক কিছুই করা যায়। সে কারণে শিউলীকে আমার মাঝ থেকে ছিনিয়ে নিলো। আমি প্রভাবহীন, অসহায়। আচ্ছা, এ বিয়েতে কি শিউলীর মতামতকে মূল্যায়ন করা হয়েছে? একবার জানতে ইচ্ছে করছে। শিউলীর যদি এ বিয়েতে আপত্তি থাকে তাহলে প্রাণপণ লড়াই করে শিউলীকে রক্ষা করবো।

কখন যে মনের অজান্তে শিউলীকে হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান দিয়েছি। কৈশোরের ভালোলাগা থেকে আস্তে আস্তে ভালোবাসায় রূপান্তরিত করেছি। যখনি পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছি ঠিক তখনি হারিয়ে গেল। গ্রামের এ রক্ষণশীল সমাজে প্রেম ভালোবাসাকে পাপ হিসেবে গণ্য করা হয়। এ সমাজ সংস্কৃতির প্রতি আমার রয়েছে অগাধ ভক্তি, ভালোবাসা। তাই প্রেম ভালোবাসার গড্ডালিকা প্রবাহে আমি গা ভাসিয়ে দিতে চাইনি। শিউলীকে কখনো বলা হয়নি, আমি তাকে কতোটা ভালোবাসি।

ফোন করলাম বাড়ির নম্বরে। একটু দেরীতে রিসিভ হলো।
– হ্যালো?
-কে, শিউলী?
শিউলী – হুম, ভাইয়াতো বাড়িতে নেই, আসলে ফোন দিতে বলবো বলে কেটে দিল।
তড়িঘড়ি ফোন রেখে দিল কেন? বুঝে উঠতে পারছিনা। আবার কল করলাম। রিসিভ করলো।
বললাম – কি হলো? ফোন রেখে দিলে কেন? আমি তোমার সাথেই কথা বলতে চাইছি।
শিউলী – ও আচ্ছা। বলুন কি বলবেন।
আমি – আমার কথাটা খুবই একান্ত। তুমি নির্জন কোথাও যাও। তারপর বলছি।
সময় নিয়ে বললো -বলুন, আমি একা আছি।
আমি – শিউলী, আমি তোমাকে…. ফোনটা আবার কেটে গেল! তার মানে শিউলী বুঝতে পেরেছে আমি তাকে কি বলতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু শুনতে চাইছেনা। হয়তো পরিবারের সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়েছে। কি আর করার? সে যদি পরিবারের সিদ্ধান্ত মেনে ভালো থাকতে চায়, তবে তাই হউক। যাকে ভালোবাসি, তার ইচ্ছাকেও ভালোবাসি।

শিউলীকে এতদিনও একতরফা ভালোবেসে এসেছি। সে ভালোবাসায় আশা ছিল, স্বপ্ন ছিল। আজ থেকে এ ভালোবাসায় যোগ হবে নতুন মাত্রা। তাকে পাবোনা, তার কাছে হয়তো আমার হৃদয়ের হাহাকার পৌঁছাবে না। সে জানবে না, কেউ একজন তাকে পাগলের মতো ভালোবাসে। তবু ভালোবেসে যাবো, ছায়া হয়ে থাকবো সবসময়। কিছু ভালোবাসা এমনই হয়।

বিকেলে বন্ধু শিমুল আসলো। আমাকে দেখে বললো তোকে খুব বিষন্ন দেখাচ্ছে কেন?
বললাম – কই নাতো?
শিমুল বললো মন খারাপ করিসনা। চল, বাজারে যাবো।
বললাম – নারে দোস্ত, এখন যাবোনা। আমার কেন যেন একা থাকতে ইচ্ছে করছে।

শিমুল – তুমি বললেই হলো? একা থাকা চলবে না। একসাথে আছি, একসাথে থাকবো। অনেক কিছু হারাবে জীবন থেকে। কিন্তু বন্ধুত্বের এ বাঁধন যেন খুলে না পড়ে। অশ্রুসজল চোখে বন্ধুর দু-চোখে ভরসা খোঁজার চেষ্টা করছি। মাথা নাড়িয়ে সাঁই দিল। হাত ধরে টেনে তুললো। আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগলাম শিমুলের হাত ধরে। পথে পথে অনেক কথা। এক পর্যায়ে শিমুল বললো, শিউলী একটা তোয়ালে কিনতে বলেছে এবং তোকেই পছন্দ করে দিতে বলেছে।

বললাম – আমি পছন্দ করে দিতে হবে কেন?
শিমুল – শিউলী বললো তোর পছন্দ নাকি অনেক ভালো হয়।
আমি একটু হেসে দিয়ে বললাম – আমার পছন্দতো অনেক দামী হয়, অনেক সময় নাগাল পাওয়া যায়না।
আমার কথা বুঝেও শিমুল না বুঝার ভান করে হেসে দিয়ে বললো টাকা আছে, টেনশন নাই। চল আগে পছন্দ কর। একের পর এক দোকানে ঢুকছি আর দেখছি। পছন্দ হচ্ছেনা। সাত-আটটি দোকান দেখে অবশেষে একটা পছন্দ করলাম। বড় তোয়ালে, একটা মাত্র গোলাপ ফুল সারা জমিনে। নিলাম। বন্ধু টাকা দিতে চাইল।
বললাম – আমাকে আজ এই সুযোগটা দে। এ নিয়ে দুই বন্ধুতে এক প্রকার যুদ্ধে বিজয়ী হলাম। টাকা দিলাম।

……..চলমান

মতামত জানান