ভালো থেকো (পর্ব-৫)

শনিবার জানুয়ারি ২৫, ২০২০ ১০:৩৬

পাতাটি ১২৬ বার পড়া হয়েছে।

৪র্থ পাতার পর…..

সকালের বাজার নিয়ে আসছিলাম বাই-সাইকেল যোগে। যে রাস্তা দিয়ে আসছি, সে রাস্তা দিয়ে শিউলী প্রতিদিন কলেজে যাতায়াত করে। আজও দেখা যাচ্ছে অদূরে। এগিয়ে আসছে। ইদানিং খয়েরি একটি এ্যাপ্রোন আর ইরানী রমনীদের মতো করে হিজাব পরে শিউলী। এতে তার সৌন্দর্য অদ্ভুতভাবে বেড়ে গেছে। চোখ সরানো যায়না কোন মতে। হঠাৎ ভাবনার জগতে নতুন কিছু উঁকি মারা শুরু করলো। শিউলী আমার বউ হলে কেমন মানাবে? দেখে নেয়া যাক। তাকে দেখার সময়টা দীর্ঘায়িত করার জন্য ইচ্ছে করেই সাইকেলের প্যাডেল চাপা বন্ধ করে দিলাম। কোন মতে এক চাপ দিয়ে আবার থেমে যাওয়া। আমি জানি শিউলী আমার দিকে একবার তাকালেও আর তাকাবেনা।

ও একটু লাজুক প্রকৃতির। ইদানিং লজ্জবোধটা আরো বেড়ে গেছে। সম্ভবত বড় হয়ে ওঠার কারণে। ক্রমশঃ আমার কাছাকাছি আসছে আর ক্রমশঃ আমার বুকের ধড়পড়ানি বেড়ে যাচ্ছে। কারণ আজ তাকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমভাবে কল্পনা করছি। একবার তাকালো আমার দিকে। চোখ দুটো যেন অপ্সরীর চোখকেও হার মানায়। শিউলীর দুটি ঠোঁট বিধাতা যেন লাভ পাতার আকৃতিতে সুনিপূণভাবে তৈরি করেছেন। খোলা চুলে একবার দেখেছিলাম ওকে। কোঁকড়ানো চুলগুলো যেন মোনালিসার সাক্ষাৎ প্রতিবিম্ব।

এককথায়, পূর্ণ যৌবনা রূপসী দেখতে যেমন হওয়া দরকার তার কোন কমতি নেই শিউলীর মধ্যে। হাঁটার সময় পদযুগল যেন মেপে মেপে ফেলে। যদি জানতে চাওয়া হয়, বাড়ি থেকে কলেজে যেতে কত কদম পড়ে? সে নিশ্চয় বলে দিতে পারবে। সম্ভবত জীবনের সবক’টি কাজ এভাবেই গোছালো পদ্ধতিতে করে। পাশ কেটে যাওয়ার সময় কিছুটা কাঁপা আর মৃদু শব্দে অভিবাধন জানালো – স্লামুলেকুম। তখনি আমার আত্মা যেন ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে এল। ‘ওয়ালাইকুমুস সালাম’ পর্যন্তই বলার সুযোগ হলো। ব্যতিক্রম অনুভুতির কারণে আর কিছু বলতে পারিনি সে মুহুর্তে। বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছি। ভাবছি, কেন এমন হচ্ছে? মন কেন আর বাঁধা মানছেনা? সিরাজুদ্দৌলা কি জিততে জিততে হারতে বসেছে? তবে কে এই অন্তরালের মীর জাফর? হুম, ছোট দুলাভাই। সর্বশেষ আমার বিবেককে হারানোর জন্য সেই দায়ী।

ইদানিং বাড়িতে ভালো লাগেনা। একা থাকতে ভালো লাগে। তাই উপজেলা হেডকোয়ার্টারে এক বড় ভাইয়ের অব্যবহৃত ছোট একটা ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে নিলাম। একমাত্র আমিই এ ঘরের বাসিন্দা। সময় কাটানোর জন্য একটা বুকসেল্প নিলাম। বইগুলো সব ওখানে সাজিয়ে ব্যক্তিগত পাঠাগারটা গুছিয়ে নিলাম। প্রথমত যে কেউ ঘরটাকে পাঠাগার ভেবে থাকে। দিনের বেলা অনেক বিজ্ঞলোক আড্ডা দিতে আসেন এখানে।

শিউলীর বিষয়টা মন থেকে সরানোর কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছিনা। ভাবলাম কিছু একটা বিষয় নিয়ে লেখালেখি শুরু করবো। তাহলে মন আর এদিকে আসার সুযোগ পাবেনা। যেই ভাবা সেই কাজ। একটা নতুন ডায়েরি নিলাম। লিখতে বসলাম। রাত ১০টা। কি লিখবো? কোন আইডিয়া খুঁজে পাচ্ছিনা। উহ্ কী যন্ত্রণা। শিউলী আমার সৃজনশীল ক্যারিয়ারেও যেন তালা মেরে দিল। এইতো ক’দিন আগে পরপর তিনটা উপন্যাস পত্রিকায় প্রকাশ করলাম। পাঠকের কাছে এগুলো খুব সমাদৃত হয়েছে। এছাড়া সামাজিক-রাজনৈতিক কত ইস্যু নিয়ে একের পর এক লিখে নামী-দামী লোকদের প্রিয়ভাজন হলাম। আজ কেন কলম চলছেনা? অসহ্য।

নাহ, লেখা যখন হবেনা তাহলে এবার বই পড়ব। কোন বইটা পড়বো? অপূর্ব অপেরা? অগ্নীবীনা? বিষাদ সিন্ধু? সবই তো পড়লাম। হুম একটা বই পুরোপুরি পড়া হয়নি। ডাঃ লুৎফর রহমান রচনা সমগ্র। এটা কিছুদিন আগে কিনেছিলাম ভোলার একটা লাইব্রেরী থেকে। বইটা হাতে নিলাম।

“সেবাকারীনি যখন ঔষধ-পথ্য নিয়ে মধুসুদনের পত্নীর কাছে গেলেন, মহৎ হৃদয় প্রেমিকা পত্নী বললেন, আমার জন্য কোন সেবাযত্নের প্রয়োজন নাই, আগে আমার স্বামীর প্রাণ রক্ষা করুন। এই বলে তিনি প্রাণত্যাগ করলেন” যুবক জীবন প্রবন্ধের এ পর্যন্ত পড়ার পর ভাবনায় চলে এল কে এই পত্নী? হ্যাঁ, মাইকেল মধুসুদনের জীবনীতে পড়েছিলাম। ১ম স্ত্রী রেবেকার সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ হওয়ার অল্পকাল পরে মধুসূদন এমিলিয়া আঁরিয়াতা সোফিয়া নামে এক ফরাসি তরুণীকে বিবাহ করেন। আঁরিয়াতা মধুসূদনের সারাজীবনের সঙ্গিনী ছিলেন। ধনীর দুলালী এই আঁরিয়েতা স্বামীর ধন সম্পদের জৌলুস দেখেননি, দেখেছেন অভুক্ত আর ঋণগ্রস্ত মানবেতর জীবন। “অভাব দরজা দিয়ে উঁকি মারলে ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়” উক্তিটির অসাড়তা প্রমাণ করেছেন তিনি।

প্রেম ভালোবাসার মহত্ব ফুটিয়ে তুলেছেন। আচ্ছা শিউলীও তো এমন হতে পারে! আমাদের দু’জনের অকৃত্রিম ভালোবাসার কাছে দুনিয়ার সব চাওয়া-পাওয়া কি হার মানবেনা? সব সংকোচ ভুলে একবার কি তার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করবো? পরিবারের চাওয়া মতে তাকে বিয়ে করলে সে আমার বর্তমান অবস্থা মেনে নিয়ে, আমার সুখ-দুঃখের ভাগ বহন করতে পারবে কিনা? আমি তাকে প্রাণ উৎসর্গ করে ভালোবাসবো। সে আমার ভালোবাসা নেবে কিনা? হুম, একবার ওকে জিজ্ঞাসা করেই নিতে পারি। কে জানে, হয়তো একদিন সেই বলবে, আমি আপনার হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনি আমাকে গ্রহণ করেন নি। আর যদি এখনই সাড়া না পাই, তাহলে না বলে দেব।

……..চলমান

মতামত জানান