ভালো থেকো (শেষ পর্ব )

রবিবার মে ১০, ২০২০ ১২:০৮

পাতাটি ৫১০ বার পড়া হয়েছে।

১৯ তম পাতার পর…..

আমার সর্বাঙ্গে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যাচ্ছে। এই প্রথম শিউলীর সাথে মনের কথা শেয়ার করতে পারলাম। আরো অনেক কিছুই বলার ছিলো। মন চাইছিলো না এত সকাল শেষ করতে। কিন্তু ও প্রান্তে একজন গৃহবধু সে। তার অনেক দায়-দায়িত্ব থাকতে পারে। দীর্ঘ সময় চ্যাট করলে শ্বশুর বাড়ির লোকদের খারাপ ধারণা সৃষ্টি হতে পারে। এসব ভেবে বেশী সময় নষ্ট করিনি।

আমার দ্বারা শিউলীর কোন ক্ষতি হউক, এটা আমি চাই না। এভাবে ঢাকায় অবস্থানের তিন দিন মেসেঞ্জারে পরস্পরের আলাপচারিতা চলতে থাকে। ভাবছিলাম স্বাভাবিক যোগাযোগের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। কিন্তু না। হঠাৎ করেই শিউলী থেমে গেলো। বাড়িতে চলে আসলাম। শিউলী কেন মেসেঞ্জারের রেসপন্স দিচ্ছেনা এটা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। দিনতো ভালোই যাচ্ছিলো। অযথা কেন এ ঝামেলায় পড়লাম?

মেসেজের কারণে শ্বশুর বাড়ির লোকদের কোন ভুল ধারণা যদি শিউলীকে একটুও কষ্ট দিয়ে থাকে, তাহলে সে কষ্টের জন্য আমিই দায়ী। কি দরকার ছিলো? একাকী কল্পনার জগতে একসময় ভালোবেসেছি, বর্তমানেও দূর থেকে ভালো চাই। শিউলীর ঘর ভাঙ্গার কোন চিন্তা আমার নেই। কিন্তু আমাদের গ্রাম্য সমাজ-সংস্কৃতি অনুযায়ী শিউলীর সাথে আমার যোগাযোগ কেউ মেনে নেবেনা। বিশেষতঃ শিউলীর স্বামী বা শ্বশুরালয়ের লোকেরা।

শিমুল ফোন করে জানালো দুইÑএকদিনের মধ্যে বাড়িতে আসবে। আমি জানি শিমুল বাড়িতে আসলে শিউলীও আসতে পারে। শিউলী হঠাৎ মেসেজের রিপ্লাই দেয়া বন্ধ করার পেছনের রহস্যটা জানা দরকার। আমিও ইদানিং আর নক করিনা। শিমুলকে বললাম, তোদের বাড়িতে অনেকদিন যাওয়া হয়না, এবার যাবো ভাবছি।

বললো, তাহলেতো ভালোই হবে। তোর বউকেও নিয়ে আয়। বললাম, মন্দ বলিসনি। সে যেতে চেয়েছে অনেকবার। আমি বলেছি ওদের বাড়িতে এখন আমাদের কেউ নেই। না শিমুল, না শিউলী। শিমুল বললো, হ্যাঁরে শিউলীও আসবে। তাহলে এবার নিয়ে আয়। বললাম, আচ্ছা নিয়ে আসবো।

শিউলীর সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করবো, আমার মেসেজ এর ফলে কোন ঝামেলায় পড়েছে কিনা? বাসায় গিয়ে তামান্নাকে বললাম, শিমুল আসছে। তোমাকে আর আমাকে যেতে বলেছে। তামান্না খুব খুশী হলো। এক বাক্যেই রাজি। এটা আমার জন্য খুব পজেটিভ হলো। শিউলীর সাথে কথা বলতে হলে আমাকে একা যাওয়া চলবেনা। একা গেলে শিউলী সামনে আসবেনা। কথামতো চলে গেলাম শিমুলদের বাড়িতে। শিউলী প্রথমত তামান্নাকে ঘরে নিয়ে গেলো, আমি একা বারান্দায় বসে থাকতে বাধ্য হলাম।

কিন্তু হাল ছাড়ার পাত্র আমি নই। আজ আমার সামনে ওকে দাঁড় করিয়েই ছাড়বো। কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে সজোরে ডাক দিলাম, শিউলী কোথায় তুমি? শিউলীও আমার মুখে এমন ডাক শুনে কিছুটা বিচলিত হয়ে উঠলো। না জানি কি হলো? এই ভেবে। পর্দ্দার ওপাশ থেকে মৃদু কণ্ঠে বললো, কিছু বলবেন? বললাম, সামনে আসলে কোন সমস্যা হবে? আমার স্বর কিছুটা রাগান্বিত দেখে শিউলী আসতে বাধ্য হলো। তারপর কোমল স্বরে বললাম, তোমার সাথে অনেক কথা আছে। এখানে সব বলা যাবেনা। বাইরে চলো।

চমকে উঠলো যেনো। এমা! সবাই কি বলবে? তাছাড়া তামান্না এতদিন পর আসলো, ওকে কিছু খেতে দিই, তারপর যা বলার এখানেই বলবেন বলে ঘুরে দাঁড়ালো। আমি আবার ছেঁছিয়ে উঠলাম, দাঁড়াও। আবার মুখ ভার করে দাঁড়িয়ে পড়লো। বললাম, আমি কিন্তু সিরিয়াসলি বলছি। আমাকে একটু সময় দিতে হবে। এখানে সবাই তোমার বাবার বাড়ির লোক এবং সবাই আমাকে চেনে। কেউ আমাদেরকে খারাপ কিছু সন্দেহ করবেনা। তারপর হাটতে লাগলো। বাড়ির আঙ্গিনায় কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে একে অন্যের মুখোমুখি দাঁড়ালাম। তাৎক্ষণিক নীরবতা। শিউলীই নীরবতা ভাঙ্গলো।

শিউলী- কিছু বলবেন?
আমি – বলবো। তার আগে বলো, মেসেজের রিপ্লাই কেন পাইনা?
কয়েক সেকেন্ড নিরব। আমি কিছু বলতে যাবো, ঠিক তখনি অভিযোগের সুরে বলে উঠলো
– আচ্ছা হঠাৎ করে আপনি আমার পেছনে কেন লাগলেন?
আমি – হঠাৎ করে?

শিউলী – তো নয় কি? আপনার সাথে আমার কোন পূর্ব সম্পর্ক আছে?
আমি কিছুটা বিব্রত হয়ে পড়লাম এ কথা’য়। মানে? হোয়াট ডু ইউ মিন?
শিউলী – অন্যভাবে নেবেন না। আপনার সাথে আমার স্বাভাবিক ভাই-বোনের সম্পর্ক ছাড়া আর এমন বিশেষ কোন সম্পর্ক বা কমিটমেন্ট আছে কিনা? যার ফলে আমি আপনার সাথে অনর্গল মেসেজে যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে?

আমি – জেনেও না জানার ভান করছো কেন?
শিউলী ঝগড়াটে ভঙ্গিমায় আমার দিকে তাকালো। কি বলছেন এসব? কি জেনে আমি না জানার ভান করছি?
আমি – তোমার আমার বিয়ের কথা হয়েছিলো। তোমার ইন্টার পরীক্ষার পরেই আমি তোমাকে বিয়ে করার কথা। এর মধ্যে পূর্ব সূত্রতা ছাড়াই হুট করে তোমাকে বিয়ে দিয়ে দিলো। তারপর কি হয়েছে জানো? দিনের পর দিন পাগলের মতো কেঁদেছি। রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটিয়েছি। বারবার চেয়েছি, তোমাকে কেড়ে নেবো ওর কাছ থেকে। আবার থেমে গেছি। তোমাকে মন থেকে ভালোবেসেছি বলে তোমার চরিত্রে কালিমা লেপন করতে চাইনি। এর থেকে বাঁচার জন্য তামান্নার প্রস্তাবে রাজী হয়ে গেছি। তাকে বিয়ে করেছি।

আমার কথায় ক্ষণিক বিরতীর সুযোগে শিউলী বলে উঠলো – এখনতো ভালো আছেন। আমার চেয়ে সুন্দর একজনকে বিয়ে করেছেন। এখন আর আগের কথা মনে করার কি দরকার?
আমি – এখন না, সব সময়ই তোমার বিরহ ব্যথায় বুক ভারী হয়ে থাকে।
একটু কৌতুকীয় হাসি নিয়ে বললো – কিন্তু কেন? ভাবীকে পছন্দ হয়নি বুঝি?

আমিও হেসে বললাম, মশকরা করোনা। তোমাকে নিয়ে যাবোনা। তুমি যেখানে আছো, সেখানেই সুখী হও। জাস্ট একটু হায়-হ্যালো করো। আর এবার বলো, কেন মেসেজের রিপ্লাই দাওনা?
শিউলী – কিছু না। এমনিতেই।
আমি – আসলে আমি ভাবছিলাম মেসেজ দিয়ে তোমার ক্ষতি করে ফেললাম কিনা, এমন কিছু হয়নি তাহলে?
শিউলী – না হয়নি। তবে হওয়ার ভয় ছিলো।

আমি – তাই?
শিউলী – হুম সেটা আমার না, আপনার। আপনার বউ দেখতে পেলে আপনার সাথে তার সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাবে। আপনাদের দুজনের ভালো সময়, আমার কারণে খারাপ হউক, এটা আমি চাইনা। তাছাড়া তামান্নার চোখে আমি নিজেও খারাপ হতে চাইনা।
আমি- আচ্ছা শিউলী, আমাকে একটা সত্য কথা বলবে?
শিউলী – হুম, বলবো।
আমি – আমার ভালোবাসা কি তোমাকে কখনো নাড়া দেয়নি?
শিউলী – না

নিজেকে খুব অসহায় মনে হলো শিউলীর জবাবে। বললাম, সত্যি বলছো?
শিউলী – সত্যি বলছি। আপনার ভালোবাসা আমাকে নাড়া দেয়নি। কিন্তু আমার ভালোবাসা আপনার মতো আমাকেও দিন রাত যন্ত্রণা দিয়েছে। আপনি একা থেকে কেঁদেছেন, পরে একজনকে মন দিয়ে যন্ত্রণা মোছন করতে পেরেছেন। তবে আমি পারিনি।

আমি কিছুটা বিচলিত হয়ে গেলাম। শিউলীর দু’চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরছে। আমি যার বিরহে যন্ত্রণার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি, সে আমাকে ভিন্ন অন্য কারো ভালোবাসাকে মিস করছে। হায়রে কপাল! আমি শিউলীর দিকে না তাকিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে আছি। লজ্জায়, ক্ষোভে, অভিমানে মাটি ভেদ করে লুকিয়ে যেতে মন চাইছে।
শিউলী কাঁদো কাঁদো গলায় বলছে, আপনি চুপ হয়ে গেলেন যে?

আমি – না, মানে… তোমার সে ভালোবাসার ব্যক্তিটা কে? তাকে একবার দেখতে চাই।
শিউলী – কেন?
আমি – আমাকে ব্যর্থ করে যে সফল হয়ে গেলো, তার কপালটা মেপে দেখবো।
শিউলীর দিকে তাকালাম। দু’চোখের কোণে জল। এক পাশের গালে বড় একটি অশ্রুবিন্দু। বললাম, বলা যাবে, কে সেই ব্যক্তি?
শিউলী – আপনি।

শব্দটি বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে আমার কানে। নাটক সিনেমায় এরকম প্রতিধ্বনি শুনে এটাকে যন্ত্রের কারসাজি বলতাম। কিন্তু এখন বাস্তবে তাই বেজে চলছে আমার কানে। শিউলীর দিকে তাকালাম। সত্যিই অপ্রাপ্তির বেদনা ফুটে আছে তার চোখেমুখে। আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়লাম। শিউলী তুমি…

শিউলী আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললো, আপনার প্রতি ছোটবেলা থেকেই দুর্বল ছিলাম। আপনার কাছে আসতে চেয়েছিলাম। আপনার সাথে বিয়ে হবে জেনে সেদিন আনন্দে লাফিয়ে উঠেছিলাম। আপনাকে বাসর ঘরে পড়তে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়বো বলে একটা ডায়েরি লিখেছিলাম। আপনি পড়ার ভেতর ডুবে যাবেন, এই ফাঁকে আমি ঘুমিয়ে পড়বো, সকালে উঠে আপনার অসহায় মুখটা দেখে বান্ধবীদের নিয়ে হাসবো, আপনাকে সব সময় রাগাবো। আপনার রাগত মুখ দেখে মজা নেবো। আরো কতো স্বপ্ন!

কিন্তু এরই মধ্যে পরিবারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়ে গেলো। প্রথমতঃ বিয়েতে কোনভাবেই রাজী হইনি। আপনার কথা বারবার মনে করে কেঁদেছি। আমার শ্বাশুড়ি মা জানতে চেয়েছেন, কারো সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক আছে কিনা? বলেছি, না। আমি এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে চাইনা। উনি আমাকে মেয়ের মতো আদর করবেন, পড়ালেখা বন্ধ করবেন না বলে কথা দিলেন। কিন্তু আমিতো ওসবের জন্য নয় বরং আপনাকে হারাতে হবে ভেবেই কেঁদেছি। এক পর্যায়ে বাবার সম্মানের দিকে তাকিয়ে রাজী হতে হলো।

বিয়ের পরে আপনার অস্বাভাবিক জীবন-যাপন আমাকে অনেক বেশী কষ্ট দিয়েছে। আমি সবসময় বিধাতার কাছে হাত তুলে দোয়া করেছি, তিনি যেন আপনার মন থেকে আমাকে মুছে ফেলেন। সবসময় দূর থেকে আপনার খবর রাখি। যখন জানলাম, আপনি তামান্নাকে বিয়ে করেছেন, তখন আমি কিছুটা স্বস্তি পেলাম। যখন দেখলাম, আপনি তাকে নিয়ে সুখে শান্তিতে আছেন তখন বিধাতাকে ধন্যবাদ দিলাম। কিন্তু সেদিন আপনার মেসেজ পেয়ে আবার চিন্তায় পড়ে গেলাম। আপনাকে আমার ভালোবাসার কথা প্রকাশ করলে আপনি বেপরোয়া হয়ে উঠবেন। তামান্নার প্রতি আপনি অবহেলা করবেন। তাই আপনার মেসেজের জবাব দেয়া বন্ধ করে দিলাম।

আমি শিউলীর এতক্ষণের কথাগুলো শুনছি আর বারবার নিজের ভাগ্যের কপালকে অদৃশ্য কোন দেয়ালে আঘাত করে যাচ্ছি। শিউলী আমার চেয়েও কোন অংশে কম ভালোবাসেনি আমাকে। আমিই দেরী করে ফেলেছি অনেক। আমার কারণেই আজ আমরা এত দূরে সরে গেছি। হায় খোদা, আমি কি ভুল করলাম! শিউলী তুমি আমাকে কখনো ক্ষমা করোনা। তোমার সমস্ত শক্তি এক করে আমাকে শাস্তি দাও, আমি বেঁচে থাকতে চাইনা।

শিউলী – আপনি আগে কোন ভুল করেন নি। কিন্তু ইদানিং অনেক বেশী ভুল করছেন। আচ্ছা, আপনি কি আমাকে এখনো ভালোবাসেন?
আমি – হুম, অনেক ভালোবাসি।
শিউলী – প্রমাণ দিতে পারবেন?
আমি – কি প্রমাণ চাও তুমি? কলিজা ছিঁড়ে হৃৎপিণ্ডটা বের করে দেখাবো?
শিউলী – আরে না, ওসব কল্পকথায় হবেনা। হৃৎপিণ্ড দেখে আমি ভালোবাসা অনুসন্ধান করতে পারবোনা। আমি কাজে প্রমাণ চাই।
আমি – কি করতে হবে বল!

শিউলী – আমাকে ভুলে যাবেন। শিউলী নামের কাউকে ভালোবাসতেন, এটা ভুলে যাবেন।
আমি – এটা সম্ভব নয়।
শিউলী – তাহলে আপনার ভালোবাসার প্রমাণ পেলাম না।
আমি -তুমি আমাকে ছাড়া ভালো থাকতে পারবে?
শিউলী -এতদিন আপনাকে ছাড়া কাটাইনি? আপনি তামান্নাকে নিয়ে সুখী হলে আমি আরো ভালো থাকবো।
আমি – তোমাকে সবসময় ভালো দেখতে চাই। তার বিনিময়ে ভুলে থাকতে হলে তাও পারবো। তবুও ভালো থেকো।
শিউলী – আপনিও ভালো থাকবেন।

তামান্না এসে পড়লো আমাদের কথার মাঝে। বললো, তোমাদের কথাতো এ জীবনেও শেষ হবেনা। আমি কতোক্ষণ অপেক্ষা করবো? শিউলী ঝটপট নিজেকে সামলে নিয়ে তামান্নাকে স্যরি ডিয়ার বলে জড়িয়ে ধরলো। আমি বললাম -অবজেকশন ইউ আর অনার, উনি আপনার ডিয়ার নয় আমার ডিয়ার। তামান্না বললো, তাহলে শিউলী কার ডিয়ার? বললাম, আমার ছিলো, এখন থেকে ছুটি দিলাম। তিনজনেই হাসতে হাসতে ঘরে ফিরলাম।

শিমুল গম্ভীর হয়ে বসে আছে। আমি ঘরে ঢুকে বললাম, তোর মুখে এতো মেঘ কেনরে? শিউলী তুই তামান্নাকে নিয়ে ঘরে যা। আর তুই বস। তোর সাথে আমার কথা আছে বলে শিমুল আমাকে বসতে বললো। শিউলী কিছুটা সন্ত্রস্ত হয়ে ঘরে চলে গেল। আমি শিমুলের দিকে তাকিয়ে আছি। সে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর বললো, আমি তোদের সব কথা শুনেছি। আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। হুম, কি শুনেছিস?

শিমুল – এগুলো আজ বাস্তবে শুনলাম। কিন্তু এতদিন দূর থেকে শুনে আসছিলাম। তুই আমার বোনকে এতো ভালোবাসিস অথচ একটিবারের জন্যও আমাকে বলতে পারলি না? আমি তোর জন্য কিছুই করতে পারতাম না। লুকোচুরি করেছিস, হেরে গেছিস, কেঁদে কেঁদে চোখের জল শুকিয়ে ফেলেছিস, এসব ভনিতা না করে সরাসরি তখন কেন বলিসনি?

আমি – ভেবেছিলাম এমনিতেইতো সব ঠিক হয়ে আছে। এর মধ্যে যে তার জীবনে আবার কেউ একজন এসে পড়বে, সেটা কল্পনাও করিনি।
শিমুল – তো, এখন কেন তাকে এসব বলতে গেলি?
আমি – বলে হাল্কা হলাম। তার কাছ থেকে জানার আগ্রহ আমার অনেক পুরনো। সুযোগ পাইনি বলে এত বছর জানতে পারিনি। আজ জানতে পারলাম, সে আমাকে অনেক ভালোবাসে। আমি স্বার্থক। আমার ভালোবাসা স্বার্থক। এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

শিমুল – এখনকার এ জানাশোনা আগের তুলনায় বেশী আবেগপ্রবণ করে তুলবে তোদের। দু’জনেরই বৈবাহিক জীবন ক্রমে খারাপ হয়ে উঠবে। আমি তোদের নিয়ে নতুনভাবে টেনশনে পড়ে গেলাম।
আমি – একদম টেনশন করবি না। আমি কি তোর চাইতে কম বুঝি?
শিমুল – নারে দোস্ত। ভালোবাসার কাছে এসব বুঝ প্রবোধ কিছুই না।
আমি – তবে কি করতে হবে, তুইই বল।

শিমুল- ডোন মাইন্ড, তুই বদলী হয়ে অনেক দূরে কোথাও চলে যা।
আমি – তুই খুশি হবি তো?
শিমুল – তোকে কাছে না পেলে সবচেয়ে বেশী খারাপ লাগবে আমার । তুই এলাকায় থাকলে হয়তো অনেক কিছুই করতে পারতি। কিন্তু তোদের মধ্যে অসময়ে যে আবেগ ফুটে উঠেছে তা তোদের দু’জনের জন্যই ক্ষতি বয়ে আনবে। তাই আমি বলছি তুই উত্তর বঙ্গে বদলী হয়ে যা এবং এক সপ্তাহের মধ্যে। তোর সব যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করে দিবি। আর একটা কথা, এটা শিউলীকে কোন দিনই বলবিনা যে, তোকে এসব আমি করতে বলেছি।

আমি – আচ্ছা, আমি কেন তোর এসব কথা মানতে হবে?
শিমুল – বন্ধুর চাওয়া বন্ধুই পুরন করবে। শিউলীকে ভালো দেখতে চাইলে তুই আমার এ পরামর্শ মেনে নিতেই হবে। নচেৎ শিউলীর ভালো না থাকার জন্য একমাত্র তুইই দায়ী থাকবি। ভেবে দেখ, যাকে ভালোবাসিস, তাকে ভালো থাকতে দিবি কিনা?
আমি – বন্ধুর চাওয়া এবং ভালোবাসাকে ভালো রাখার স্বার্থে আমি সব করতে পারি। আমি তোর সব দাবী মেনে নিলাম।

তারপর সচিবালয়ে চিঠি লিখে অনেকগুলো অহেতুক কারণ দেখিয়ে বদলীর আবেদন করলাম। বদলীর আদেশ এসে গেল দুইদিনের মধ্যেই। কর্তৃপক্ষের আমার প্রতি ভালো ধারণার কারণে আমার সব চাওয়া তড়িৎ গতিতে পুরণ হয়ে যায়। বাড়ীতে এসে তামান্নাকে বদলী আদেশের চিঠি দেখালাম। মুহুর্তেই যেন তার কলিজায় দাউ দাউ করে আগুণ জ্বলে উঠলো।

আমার দিকে অসহায় ভঙ্গিতে তাকিয়ে বললো এটা কেন হলো? বললাম, কর্তৃপক্ষ চেয়েছে বলেই। তামান্না বললো- তুমি এটা কেনসেল করাও। বললাম, আমি এটা কেনসেল করাতে আগ্রহী না। তামান্না – কেন? বললাম – সব সময় কর্তৃপক্ষের আদেশ কেনসেল করানোটা ভালো কোন ফল দেয়না। মাঝেমধ্যে মাথা পেতে নিতে হয়। আমি গিয়ে তোমাদেরকে নেওয়ার ব্যবস্থা করবো।

প্রয়োজনীয় ব্যাগপত্র তামান্নার সহযোগিতায় গুচিয়ে নিলাম। অফিসে এসে মোবাইলের সিমকার্ডগুলো ভেঙ্গে ফেললাম। ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, ইমো, হোয়াটস অ্যাপসহ সব ধরণের একাউন্ট ডিঅ্যাক্টিভ করে দিলাম। মোবাইলে নতুন একটা সিম লাগিয়ে নিলাম। বন্ধুকে একবার ফোন দেব? না, কাউকে ফোন দেব না। এ নম্বর আপাতত আমার বলে প্রকাশ করবো না।

আমি এখন উত্তর বঙ্গে। নিজ এলাকার কোন মানুষ দেখলে লুকিয়ে পড়ি। যেন এলাকায় কোন অঘটন ঘটিয়ে এখানে এসে গা-ঢাকা দিয়েছি। ভালোবাসাকে ভালো রাখতে নির্বাসনে থাকতে হচ্ছে আমাকে। হয়তো আমার জীবনের শেষ দিন অবধি আর শিউলীর সাথে দেখা হবে না। দূর থেকে শুধু বলবো ভালো থেকো।

মতামত জানান