আজ আবীরের বিয়ে — অন্ধকার : প্রথম পর্ব

লেখক:
প্রকাশ: রবিবার এপ্রিল ২৬, ২০২০ ১:৩৯ পূর্বাহ্ণ
পাতাটি ২,৬৮৪ বার পড়া হয়েছে।

সকাল নয়টায় এসে কাজী অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আবীর। গতকাল রাতে রূপকথা তাকে বলেছিল আজ সে আবীরকে বিয়ে করবে। আবীরের মনে আনন্দ ধরে না। অনেক সাধনার পর রূপকথা বিয়ে করতে রাজি হয়েছে, যদিও ছোট একটা শর্ত সে দিয়েছে। তিনশত টাকার রেভিনিউ ষ্ট্যাম্পে সাইন করতে হবে আবীরকে। একটাই মাত্র শর্ত, বিয়ের পর আবীর আর কোনদিন রূপকথার সাথে যোগাযোগ রাখতে পারবেন না। যোগাযোগের কোন প্রকার চেষ্টাও করতে পারবে না। আবীর বুঝতে পেরেছে, এটা আত্মবিধ্বংসী সিদ্ধান্ত; তবুও সে রাজি হয়েছে।

নিউ হোস্টেল মসজিদের উল্টোপাশেই কাজী সাহেবের অফিস। তিনি এখন নেই, আসবেন বেলা দুটোয়। আবীর রূপকথাকে ফোন করে, ‘হ্যালো’, রূপকথার কণ্ঠশুনে বুক কেঁপে উঠে আবীরের। নিজেকে সামলে নিয়ে বলে—’কেমন আছ, রূপা?’

— ভালো! এখন ফোন করেছ কেন? কাজী সাহেব কখন আসবেন?

— কাজী সাহেব আসবেন দুটোয়, তুমি কখন আসবে?

— আমি ঠিক সময়েই চলে আসবো। এখন রাখো।

এরপর লাইন কেটে দেয় রূপকথা।

রূপকথা পছন্দ করে না বলে সিগারেট খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে আবীর। এখন তার সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছে। একটা সিগারেট খেলে এমন কী হবে আর, রূপা তো এখন পাশে নেই। সে আসার আগে একটা ক্যাণ্ডি খেলে সিগারেটের গন্ধ টেরও পাবে না। তবু সিগারেট কিনে না আবীর, রূপা দেখবে না বলে তো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা যাবে না।

রূপকথা ফোন করে, আবীর ভয়ে ভয়ে রিসিভ করে, হ্যালো। রূপা বলে — ষ্ট্যাম্প কিনেছ? তিনশো টাকার ষ্ট্যাম্প?

— হ্যাঁ, কিনেছি।

— ঠিক আছি। রাখি, আমি ঠিক সময়েই চলে আসবো।

মসজিদের পাশের ছোট দোকানটির সামনে বসে আবীর, একপিস কেক আর একটা স্পীড ক্যানের অর্ডার করে সে। কেক পিস হাতে নিয়ে একটা কফি অর্ডার করে। দোকানদার জিজ্ঞেস করে, স্পীড দিবো না?

— স্পীডও দিন।

কফি আর কেক খেতে খেতে আবীরের মনে পড়ে গতরাতের স্বপ্নের কথা।

কাজী অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আবীর। প্রচণ্ড গরমে ঘেমে জবুথুবু হয়ে গেছে সে। রূপকথা আসার কথা দশটায়, এখনো আসছে না। আবীর বারবার তাকে ফোন করছে, সে কেটে দিচ্ছে। আবীর ভাবছে রূপকথা কি তবে আসবে না? না, এমন করবে না রূপকথা। সে কথার খেলাপ করে না। একটু রাগী মেয়ে। বদরাগীও বলা চলে, তবে ধোকাবাজ নয়।

যাকে একবার ভাবনায় পেয়ে বসে, ভাবনা তার পিছু ছাড়ে না। আবীর ভাবছে, কোন সমস্যা হয়নি তো? রূপকথা ঠিক আসতে পারবে তো?

রূপকথা এসেছিল ঠিক দুটো বাজে। কাজী সাহেব বিরক্ত। এত দেরী করালে, আমার তো অন্য কাজ আছে। রূপা এসে হাসি মুখে আবীরকে জিজ্ঞেস করলো, কেমন আছ, আবীর?

— এখন ভালো আছি। এতক্ষণ টেনশনে ছিলাম।

— চলো। কাজী সাহেব আছেন তো?

— হ্যাঁ, তিনি তো সে দশটা থেকে বসে আছেন। আমি বারবার অনুরোধ করে তাকে বসিয়ে রেখেছি।

— সাক্ষী এনেছ?

— মসজিদের মুয়াজ্জিন আর তার এক পরিচিত লোক সাক্ষী হবেন। কিছু টাকা দিতে হবে তাদের।

— ওকে। স্ট্যাম্প কই?

— আমার কাছেই।

কথা বলতে বলতে দুজন কাজী অফিসের ভিতরে চলে যায়। কাজী সাহেব ব্যস্ত মানুষ। বললেন, তাড়াতাড়ি আপনাদের আইডি কার্ডের কপি দিন। রূপা আইডিকার্ড বের করে দেয়, বলে কপি নেই, করে নিন।

আবীর তার নিজের ও রূপকথার আইডি কার্ডের কপি বের করে দিলে, কাজী সাহেব নীল রঙের একটি বই বের করে তাতে ফরম পূরণ করতে লাগলেন।

রূপকথার একটা ফোন এসেছে, কে করেছে জানে না আবীর। তবে রূপার কোন বন্ধু হবে তা বোঝা যাচ্ছে। রূপা বলছে, — হ্যাঁ, আমি কাজী অফিসে আছি। নিউ হোস্টেলের সামনের কাজী অফিসে। আবীরও আছে। তুমি আসবে? ঠিক আছে, ঠিক আছে।

ফোন রেখে দিয়ে রূপকথা বলে আমি বিয়ে করবো না। এভাবে বিয়ের করার কোন মানে হয় না। তাছাড়া তোমাকে আমার পছন্দ নয়। এতদিন বলতে পারিনি, আজ বলে দিলাম। মন খারাপ করো না।

আবীরের ঘুম ভেঙে যায়, সে কাঁপতে থাকে। মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে সময় দেখে। রাত পৌঁনে চারটা। খুব অস্থির লাগে তার। কিছুক্ষণ বিছানায় গড়াগড়ি করে বাথরুমে চলে যায় সে।

স্বপ্নের কথা ভাবতে ভাবতে আবারও ঘেমে গেছে আবীর। তার হাত কাঁপছে। তাড়াতাড়ি কপির কাপটি দোকানির সামনে রেখে সে দোকান থেকে বেরিয়ে আসে। রূপকথাকে ফোন করে, — হ্যালো।

— হ্যাঁ, বলো।

— তুমি আসবে তো?

— আসবো।

— বিয়ে করবে তো সত্যি?

— করবো।

— আমার না, ভয় ভয় লাগছে। তুমি যদি না আসো?

— আমি আসবো শিউর। বিয়েও হবে, তুমি নিশ্চিত থাকো।

বাইরে ঘোরাঘুরি করতে আর ভালো লাগছে না আবীরের। একে তো রোদ, তার উপর ধুলোবালি। সভ্যতার এই এক অত্যাচার। মসজিদের অযুখানায় অযু করে আবীর মসজিদে গিয়ে বসে। মোবাইলে কুরআন খুলে পড়তে থাকে। মনে মনে দোয়া করতে থাকে। হে আল্লাহ, তুমি আমাদের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের তওফিক দান করো। আমাদের কল্যাণের পথ দেখাও।

পৌনে দুটায় আবীর মসজিদ থেকে বের হয়ে কল করে রূপকথাকে। সে জানায় পথে আছে। ঠিক দুটায় পৌঁছে যাবে। আবীর আর রূপকথার পরিচয় বছর পাঁচেক আগে। প্রথম দর্শনে প্রেমে পড়ার মতো আবীর রূপাকে পছন্দ করে। কিন্তু বলা হয় না। মাস তিনেক পরে রূপার সাথে তার যোগাযোগ হয়। সাধারণ বন্ধুর মতো তাদের যোগাযোগ হতে থাকে মাঝে মাঝে। একসময় আবীর তাকে পছন্দের কথা জানায়। রূপা জানায়, এই মুহুর্তে সম্পর্কের বিষয়ে ভাবছে না সে। অন্তত বিশ সালের আগে ভাবতে চায় না। আবীর বলে আমি অপেক্ষায় থাকবো।

ঊনিশ সালের জানুয়ারি প্রথম সপ্তাহে রূপকথা আবীরকে জানায়, সে বিয়ে করতে রাজি। এরপর সম্পর্কের নতুন মোড় নেয়। কিন্তু রূপার পরিবার এই সম্পর্কে মেনে নিতে রাজি হয় না। রূপাও পরিবারের সিদ্ধান্তের বাইরে কিছু করতে পারবে না বলে জানিয়ে দেয়। ভঙ্গপক্ষবলাকার মতো আবীরের কাতরানো কানে যায় না রূপার। তবে তাদের যোগাযোগ স্বাভাবিক বন্ধ হয় না।

সময় বয়ে যায়। রূপাকে না পাওয়ার শোকে ভেঙে পড়ে আবীর। জীবনের স্বাভাবিক গতি বিঘ্নিত হয়। কোন কিছুই তার সময় মতো হয়ে উঠে না। কোন কাজে মন বসে না। বেঁচে থাকাও যেন নিরানন্দ হয়ে গেছে। সে নিয়মিত রূপকথাকে বিরক্ত করতে থাকে বিয়ের জন্য। রূপকথা রাজী হয় না। আবীর জোর করে রাজি করানোর চেষ্টা করে। হিতেবিপরীত হয়, রূপকথা যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় আবীরের সাথে। তবু নিরাশ হয় না আবীর।

আবীরের জোরাজুরি বা অন্য কোন কারণেই হোক, গতকাল রাতে রূপকথা জানিয়েছে— আজ সে আবীরকে বিয়ে করবে। আবীর সেই কারণে কাজী অফিসের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে রূপকথার অপেক্ষায়।

ঠিক দুটা বাজবার পাঁচ মিনিট আগে রূপকথা এসেছে। দুজন কাজী অফিসে প্রবেশ করলো। কাজী সাহেব বললেন, আপনাদের আইডির কপি দিন। রূপকথা বললো, কেন?

কাগজপত্র পূরণ করতে আইডি কার্ডের কপি লাগবে তো। তাছাড়া এককপি আমাকে দিতে হবে। আপনাদের ছবি এনেছেন?

রূপকথা বলে— এসব লাগবে না। আমাদের বিয়ে হবে না।

আবীরের মনে পড়ে রাতের স্বপ্নের কথা। তবু মরিয়া হয়ে বলে, কেন করবে না? তুমি না আমাকে একটু আগেও বলেছ বিয়ে করবে?

— একটু আগে বলেছি করবো, এখন বলছি করবো না। আপনি কি আমাকে জোর করে বিয়ে করবেন?

কাজী সাহেব বললেন, দেখুন এই বিয়ের কাজ করতে পারবো না আমি। আগে আপনারা ঠিক হয়ে আসুন। অন্য কাজী অফিসে যান, অথবা অভিভাবক নিয়ে আসেন।

রূপকথা ‘আমি চললাম’ বলে বেরিয়ে গেল। এবার আপনিও যান, বলে কাজী সাহেব চলে গেলেন অন্য কক্ষে।

উপন্যাস: অন্ধকার

মতামত জানান