আম্রপালী : প্রথম পরিচ্ছেদ

বৃহস্পতিবার আগস্ট ৬, ২০২০ ০৭:২৫

পাতাটি ১,৮৯৯ বার পড়া হয়েছে।

অপরাহ্ণ৷ দগ্ধকাঞ্চনবৎ সৌরদ্যূতি ক্রমে ম্লান হচ্ছে, দিগন্তবলয়ে আশ্রয়প্রার্থী দিনমণি৷ সারাদিনের প্রস্তুতি শেষে দিগন্তরেখার ওপারে চলে যাবে সূর্য৷ সে সময়ে শতাধিক শ্রমণকে অষ্টাঙ্গিক মার্গ শিক্ষা দিচ্ছেন ঋষি অমিতাভ৷ মঠের বহিঃদ্বারে দাঁড়িয়ে আছেন অপার্থিব সৌন্দর্যের অধিকারিণী এক নারী৷ দীঘলাঙ্গী, হরিণাক্ষী৷ নিম্নাক্ষীপাত হতে ঈষৎ উত্থিত৷ কপোলে মুক্তার মতো সফেদ বারিবিন্দু৷ কম্পিত অধরোষ্ঠ, স্নিগ্ধমায়াময় মুখমণ্ডল৷ বাসন্তী মলয়ে ভেসে তার দৈহিক সুবাস পৌঁছে গেছে মঠাভ্যন্তরে৷ বিচলিত হয়ে উঠছেন সংসার বিরাগী শিক্ষার্থী ভিক্ষুগণ৷

ঋষি অমিতাভ বহিঃদ্বারে এসে সরাসরি জানতে চাইলেন, — দেবী! কে আপনি? কী প্রয়োজন এখানে?

তেজ ও দীপ্তিময় অক্ষিযুগল অবনত হলো৷ ভ্রূযুগলের মধ্যবর্তী ঋজুতা ও মুখাবয়বে ভেসে উঠলো করুণ আর্তি৷ জ্যামুক্ত তীরের মতো দৃষ্টিপাত করলেন ঋষির প্রতি৷ বললেন,— আমি আম্রপালি! আমার বিশেষ সমস্যা আছে৷ আমি জানি একমাত্র আপনার নিকটই আমার সমস্যা সমূহের সমাধান আছে৷ আপনিই পারেন আমাকে নির্বাণ দান করতে৷

বেদীতে উপবেশন করলেন ঋষি, অনুমতি দিলেন,— কাছে আসুন৷

বেদীমূলে উপবেশন করলেন আম্রপালি৷ ঋষি আজ্ঞা করলেন,— দেবী! বলুন আপনার সমস্যা সমূহ৷
আম্রপালি বললেন,— আমার সমস্যা সমূহ শোনার আগে আমার জীবন কাহিনী শুনুন৷ তার আগে আপনার ভিক্ষুগণকে সরে যেতে বলুন৷ আমার কাহিনী আমি একান্তই আপনাকে শোনাতে চাই৷

অমিতাভ ভিক্ষুগণকে মঠাভ্যন্তরে চলে যেতে ইঙ্গিত করলেন৷ ভিক্ষুগণ চলে গেলে পুনরায় বললেন,— বলুন, দেবী!

আম্রপালি বলতে লাগলেন,— আমার জন্মদাতা-জন্মদাত্রী কে আমি জানি না৷ যারা আমাকে সন্তানবৎ পালন করেছেন, আমি তাদেরকেই পিতামাতার মর্যাদা প্রদান করি৷ আমার পিতামাতা বৈশালী নগরীর এক আম্রবৃক্ষের নিচে আমাকে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন৷ এই কারণে তারা আমার নাম দিয়েছেন আম্রপালি৷ বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে আমার সৌন্দর্য্যের দ্যূতি ছড়িয়ে পড়ে বৈশালী নগরে দিকে দিকে৷ নগরের প্রভাবশালী ও ধনবান পুরুষেরা মক্ষিকার মতো আমার চারিদিকে গুঞ্জরণ শুরু করে৷ তারা আমাকে বিবাহ করতে চায়৷ আমি কাকে ছেড়ে কাকে বিবাহ করবো বিভ্রান্ত হয়ে যাই, আমার পিতামাতাও স্থির সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না৷ গণতান্ত্রিক বৈশালী নগরী, যত শক্তিমান আর ধনশালী পুরুষই হোক আমার অমতে আমাকে বিবাহ করার ক্ষমতা কারো ছিল না৷ তবু, আমাকে বিবাহ করার জন্য নাগরিক পুরুষদের মাঝে প্রতিদ্বন্ধিতা শুরু হয়ে গিয়েছিল৷

৪৭৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের এক বাসন্তি অপরাহ্ণে নগরবধূ আম্রপালি তার জীবনেতিহাস শুনিয়েছিলেন মহাঋষি গৌতম বুদ্ধকে৷ আজ প্রায় আড়াই হাজার বছর পর ২০২০ সালের এক নিশীথে আমি আমার জীবনেতিহাস শোনাবো আপনাদের৷

আমার জন্মদাত্রী মা ছিলেন হতদরিদ্রা৷ বাবা চালাতেন রিকশা৷ আমার আগে আমার আরও চার বোন জন্মেছিলেন৷ দরিদ্রের হাভাতে সংসারে এত কন্যা রীতিমত বিভীষিকা৷ একপুত্র লাভের আকাঙ্ক্ষায় আমি মায়ের পেটে জন্মেছিলাম৷ আমি কাঙ্ক্ষিত ছিলাম না৷ মা-বাবা আগেই স্থির করেছিলেন, কন্যা হলে আমাকে আঁতুড়েই বিনাশ করা হবে৷ চিকিৎসা বিজ্ঞান অনেক এগিয়ে গিয়েছে৷ কোন এক শুভাকাঙ্ক্ষিনী মহিলার পরামর্শে মা হাসপাতালে পরীক্ষা করে জানলেন, এবারেও তার কন্যা জন্মাবে৷ রাতে বাবা-মা পরামর্শ করলেন, প্রাচীন আয়ূর্বেদ চিকিৎসার সফল প্রয়োগে আমাকে ভ্রূণেই হত্যা করবেন৷ কিন্তু আজকাল ভালো কবিরাজ পাওয়া যায় না৷ তবু বাবা কোথা থেকে কী নিয়ে এলেন৷ মা খেলেন, আমার ভাগ্য কী দুর্ভাগ্য জানি না, মায়ের গর্ভপাত হলো না৷ এবারের মতো আমি বেঁচে গেলাম৷

কিন্তু আমাকে দুনিয়ার আলো দেখানো হবে না, এই প্রতিজ্ঞা যখন মা-বাবা করেছেন, তাহলে আমাকে ভ্রূণে হত্যা করাই উত্তম৷ অযথা এক অনাকাঙ্ক্ষিতাকে দেহের রক্তপান করিয়ে জন্মাবধি বাঁচিয়ে রাখার মানে হয় না৷ বাবা তার রিকশায় চড়িয়ে মাকে নিয়ে গেলেন কুচাতলি সরকারী হাসপাতালে৷

কথায় বলে, রাখে আল্লাহ মারে কে? মা বহির্বিভাগে ডাক্তার দেখালেন, আর আমার ভ্রূণকে বিনাশ করার জন্য ভর্তি হয়ে গেলেন৷ আমি জানি না, তখন মায়ের মুখমণ্ডল ঠিক কেমন দেখাচ্ছিল? বড় হয়ে আমি বহুবার আমার জন্মদাত্রীর সাথে গোপনে দেখা করতে গেছি৷ আমার জন্মদাত্রীকে আমি অনেক মমতাময়ী রূপে দেখেছি, যদিও আমার খুব ইচ্ছে করে মায়ের সেদিনের সেই মুখচ্ছবিটা একবার দেখতে৷ বলেছিলাম না, মা-বাবা আমাকে যতই মেরে ফেলতে চেষ্টা করুন না কেন, যে মহাপ্রভূ আমাকে পৃথিবীতে পাঠানোর আদেশ দিয়েছিলেন, তিনি তো আমার দীর্ঘ হায়াত লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন আগেই৷ আমাকে ভ্রূণে হত্যা করা হয়নি৷ হাসপাতালের এক নার্স মাকে বলেছিলেন, ভ্রূণ নষ্ট না করে সন্তান বিক্রি করে দিন৷ ভ্রূণ নষ্ট করলে পাপ হবে, কিন্তু বিক্রি করলে নগদ টাকাও পাবেন, বাচ্চাটি কোন নিঃসন্তান দম্পতির শুন্য হৃদয় পূর্ণ করে দিবে৷

সেদিন মায়ের মুখে এই কথা শুনে বাবার মুখ আনন্দে আলোকিত হয়েছিল কিনা জানি না, তবু আজ আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই৷ সেদিন যদি আমাকে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত না নিতেন তাহলে আজ আপনাদের আমার জীবন কাহিনী শোনানো হতো না৷ এই ত্রিশ বছরের জীবনে আমি যা পেয়েছি, যা পাইনি— জীবনকে যতটুকু উপভোগ করেছি তা পারতাম না৷ আমি কুচাতলি হাসপাতালে সেই বুদ্ধিমতি নার্সটিকেও খুঁজেছি৷ তাকে পাইনি৷ পেলে তার পদধূলি মাথায় নিতাম৷

কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের এক কর্মকর্তা আমাকে কিনে নিয়েছেন৷ নগদ বিশ হাজার টাকা দিয়েছেন বাবার হাতে৷ মা এবং তার গর্ভের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা টাকা দিলেন৷ আমার পালিতা মায়ের আলমারিতে আমাকে ক্রয়ের দলিলটি এখনও রক্ষিত আছে৷ যখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি, তখন কোন জরুরী জিনিস খুঁজতে গিয়ে সেই দলিলটি আমি দেখেছি৷ এর আগে আমি জানতাম না যে আমাকে বিশ হাজার টাকা দিয়ে কেনা হয়েছিল৷ সে দলিলে স্পষ্ট লেখা আছে, জন্মের সাথে সাথেই আমাকে হস্তান্তর করতে হবে৷ যদি কোন কারণে আমার মৃত জন্ম হয়, তবে আরেকটি সন্তান ধারণ করে পুষিয়ে দিতে হবে৷

প্রথম যেদিন দলিলটি পড়েছি, গোপনে আমি অনেক কেঁদেছি৷ স্কুল ফাঁকি দিয়ে আমার বান্ধবী রূপার বাসায় চলে গিয়েছিলাম৷ তার মা-বাবা চাকরিজীবী, তাই বাসা থাকে খালি৷ সারাদিন আমি কেঁদেছি৷ আমার বারবারই মনে হয়েছিল, কারো প্রয়োজনহীনতা, কারো প্রয়োজন আমাকে আম্রপালি বানিয়ে দিয়েছে৷ আম্রপালির মতো মায়ের দুধের স্বাদ আমি পাইনি৷

আম্রপালি ঋষি অমিতাভকে তার জীবন কাহিনী শোনাচ্ছেন৷— শুনুন অমিতাভ! আমার রূপমুগ্ধ পুরুষেরা আমার পিতামাতাকে মক্ষিকার মতো ঘিরে ধরেছেন৷ তারা যেকোন ভাবেই হোক, যেকোন কিছুর বিনিময়েই হোক আমাকে স্ত্রী করতে চান৷ কিন্তু আমি একজন আম্রপালী৷ কী করে নগরের সকল পুরুষের স্ত্রী হতে পারি?

পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, আমাকে পাওয়ার নেশায় নাগরিক পুরুষেরা পরস্পরকে হত্যা করতেও পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন৷ এই খবর যথা সময়ে বৈশালীর নাগরিক সভায় আলোচিত হলো৷ আমাকে নাগরিক সভায় ডাকা হলো৷ সিদ্ধান্ত হলো, কোন পুরুষের সাথেই আমার বিবাহ হবে না৷ আমি হব রাষ্ট্র স্বীকৃত নগরবধূ৷ নাগরিকেরা আমার কাছে আসবেন৷ অর্থের বিনিময়ে আমার রূপ-যৌবন আর দেহসুধা উপভোগ করবেন৷

অমিতাভ মনোযোগ সহযোগে আম্রপালীর কাহিনী শুনে যাচ্ছেন৷ আম্রপালী বলে চলেছেন,— আমিই সম্ভবত পৃথিবীর প্রথম ও শেষ নগরবধূ যাকে বেশ্যবৃত্তির জন্য রাষ্ট্র অনুমতি প্রদান করেছে৷ বৈশালীর নাগরিকদের সুখশান্তি, সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধের অবসান হেতু আমি নাগরিক সভার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলাম৷ কিন্তু এখানেই শেষ নয়৷ বৈশালীর শক্তিশালী প্রতিবেশী রাজ্য মগধের সম্রাট বিম্বিসারের কানেও আমার রূপের খবর পৌঁছে গিয়েছিল৷

একদিন এক বিদেশী বণিক এসেছিল আমার কাছে৷ তার নাম ছিল শ্রেণিক৷ নিয়মানুযায়ী কোন বিদেশী আমার কাছে আসতে পারবে না৷ আমি শুধু বৈশালীর পুরুষদের জন্য নিবেদিতা৷ কিন্তু আমার আশ্রম ছিল নগরের বাইরে৷ আর শ্রেণিককে দেখে আমারও ভালো লেগেছিল৷ শ্রেণিককে আমার সদ্বংশজাত পুরুষ মনে হয়েছিল৷ তাই তাকে বারণ করতে পারিনি৷

আমার দেহ-রূপ উপভোগের পর শ্রেণিক তার আত্মপরিচয় জানালেন৷ আমি মুগ্ধ হলাম, মগধের সম্রাট বিম্বিসার আমার পাণিপ্রার্থী হলেন৷ তিনি আমাকে রাণী করে মগধে নিয়ে যেতে চাইলেন৷ কিন্তু যে আম্রপালী বৈশালীর নাগরিকদের সুখ এবং রাজ্যের গৃহযুদ্ধের সম্ভাব্যতাকে অবসানের জন্য নগরবধূ হয়েছি, সে আম্রপালী কী করে মগধের রাণী হবো? আমার মগধের রাণী হবার আকাঙ্ক্ষা বৈশালী আর মগধের মধ্যে যুদ্ধের সূচনা করবে৷ আমি সম্রাট বিম্বিসারকে ফিরিয়ে দিলাম৷

সম্রাট বিম্বিসার স্বরাজ্য মগধে ফিরে গেলেও আমার কাছে নিয়মিত আসা-যাওয়া শুরু করেছেন৷ প্রয়োজনে যুদ্ধ করে আমাকে লুটে নেবার পরিকল্পনা তাঁর আছে৷ কিন্তু আমার প্রতি রাজনের আসক্তির খবর পৌঁছে গেছে রাজকুমার অজাতশত্রুর কাছে৷ অজাতশত্রু রাজপুত্র হলেও তার চরিত্র কালিমালিপ্ত৷ তিনিও ছদ্মবেশে ছুটে এলেন আমার কাছে৷ আমার রূপ-যৌবন আর দেহসুধায় তিনিও মুগ্ধ হলেন৷ আমাকে বিবাহ করার প্রস্তাব করলেন, আমি তাকেও প্রত্যাখ্যান করলাম৷ তিনি স্বদেশে ফিরে গেলেন বটে, কিন্তু আমাকে নিয়ে পিতা বিম্বিসারের সাথে প্রতিদ্বন্ধিতা শুরু করলেন৷ এরপর আমাকে নিরুঙ্কুশভাবে পাবার জন্য তিনি তার পিতা বিম্বিসারকে হত্যা করে রাজক্ষমতা দখল করলেন৷

আম্রপালী নিজের জীবন কাহিনী শোনাচ্ছেন মহামতি গৌতম বুদ্ধকে৷ স্থিরচিত্ত অমিতাভ আম্রপালীর কাহিনী মনোযোগ দিয়েই শুনছিলেন৷ তৎক্ষণাৎ আম্রপালী তার পদে লুটিয়ে পড়ে বললেন,— প্রভূ! আপনি আমাকে আশ্রয় দিন৷ আমার জন্য এক যুবক তার পিতা ও রাজ্যের সম্রাটকে হত্যা করে দুটো মহাপাপে জর্জরিত হয়েছে৷ এই অনুতাপ আমাকে দগ্ধ করে চলেছে৷ আমাকে আপনি দীক্ষা দিন৷ আমি নির্বাণ কামনা করি, প্রভূ!

দিনমণি অস্তমিত হয়ে চলে গেছে দিগন্তরেখার ওপারে৷ তাম্রবর্ণ গোধূলী মিলিয়ে গেছে ঝপসা অন্ধকারে৷ এক মহাপুরুষের পদতলে নির্বাণ আকাঙ্ক্ষায় লুটিয়ে পড়েছেন এক অনুতপ্তা রমণী৷

মহামতি ঋষি অমিতাভ চক্ষু মুদলেন৷ আবৃত্তি করলেন,—সব্বে সত্তা সুখিতা ভবন্তু, নিব্বানং পরমং সুখং৷

মতামত জানান