বনলতা সেন পতিতা নন, মন্বন্তর বিধ্বস্ত বাংলা

শনিবার মে ২, ২০২০ ১০:২৬

পাতাটি ৭৪৩ বার পড়া হয়েছে।

শুধুমাত্র কিছু ব্যক্তিগত ঘটনার মধ্যে কবিতার মূল্য নিহিত থাকে না। কাজেই কবিতা লেখার সময়ে কবি কোন পোষাক পরিধান করে কবিতা লিখতেন, কবিতা লেখার সময় কবি নিমপাতার শরবৎ খেতেন নাকি চিরতা খেতেন, তাঁর বাড়ির পাশের কোন মেয়েটি/ছেলেটি তাঁর দিকে তাকাত—এসবের বেশি যদি কিছুই উদ্ধার করা না যায় সেটা ‘ষ্টাডি’ পদবাচ্য নয় । তাকে ‘ষ্টাডি’ আখ্যা দেওয়া কিন্তু (জ্ঞান জগতে) অপরাধ (‘স্টাডি’ বানানটা কেন ভুল তার ধ্বনিতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আছে, পরে লিখব)।

বনলতা সেন পতিতা হলে অশোক-বিম্বিসারের জগতের তাৎপর্য কী সেই “ষ্টাডি” অনুযায়ী? হাজার বছরের তাৎপর্য কী? ধূসরতা, অন্ধকারের তাৎপর্য কী? পথ হাঁটার তাৎপর্য কী? দু’দণ্ডের তাৎপর্য কী? দু’দণ্ডের সঙ্গে হাজার বছরের juxtaposition-এর তাৎপর্য কী?

শৈলীর পার্থক্য থাকলেও রামপ্রসাদ, উইলিয়াম ব্লেক, শেলী, কীটস থেকে শুরু করে জীবনানন্দ দাশ, জসীমউদ্দীন, সলিল চৌধুরী প্রমুখের লেখায় বাদ-প্রতিবাদের দ্বন্দ্ব বারবার ফুটে উঠেছে। ব্লেকের কবিতা যেমন শুধু মাত্র ‘দ্য ল্যাম’ (‘The Lamb’) পড়ে কিছুই বোঝা যাবে না তার anti-thesis ‘দ্য টাইগার’ (‘The Tyger’) না পড়লে, জীবনান্দের কবিতায়ও তেমনি শুধুমাত্র একটিমাত্র পক্ষ বনলতা সেনের অর্থ উদ্ধার করা অসম্ভব এর anti-thesis টি ধরতে না পারলে।

বনলতা সেনের প্রতীকের খোঁজে ভাষাতত্ত্বে সস্যিয়রের (সস্যুর বানানে ব্যাপক পরিচিত) ব্যবহৃত ল্যঁ-পার্হোল এবং দর্শনে ব্যবহৃত দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির একটি দ্বিযোজীর মাধ্যমে সুন্দরভাবে ধরা যায়।

ল্যঁ (LANGUE): সমগ্র (অংশ দিয়ে গঠিত)

  • হাজার (বা হাজার-হাজার) বছরের diachronic ভ্রমণ, বা ইতিহাস ভ্রমণ।

পার্হোল (PAROLE): অংশ (সমগ্রের একক)

  • বিম্বিসার-অশোকের জগতের ধূসরতা (সময় বয়ে যাওয়ার কারণে, এবং/অথবা রাজতন্ত্রে ভালো আর খারাপ শাসনের মধ্যবর্তী, আলো-আঁধারের মাঝে)
  • বিদর্ভের অন্ধকার (খারাপ শাসন/সময়) ইত্যাদি ইতিহাসের পথে (মানস) ভ্রমণকারীকে শুধু ক্লান্তই করেছে।
  • ইতিহাসের এই ভ্রমণে একমাত্র শান্তির কাল হতে পারে দুঃশাসন মুক্ত গ্রামবাংলার সমৃদ্ধি। এই শান্তি/স্নিগ্ধতাই বনলতা সেন।

বাদ (THESIS)

  • বনলতা সেন কোন মূর্ত/জৈব নারী নন। নাটোর অবিভক্ত বাংলার এক গ্রাম। আর তার স্নিগ্ধতাই বনলতা সেন।

প্রতিবাদ (ANTITHESIS)

  • এ স্নিগ্ধতার শান্তি সে ভ্রমণকারীকে ‘দিয়েছিলো’ (মানে, এখন আর দিতে পারে না) হাজার-হাজার বছরের প্রেক্ষিতে ‘দু-দণ্ড’ মাত্র, কারণ ব্রিটিশ-পিশাচের উৎপাদ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নাটোরের মত গ্রামগুলির সমৃদ্ধি/স্নিগ্ধতা (=বনলতা সেন) ধ্বংস করেছিল।”

সমগ্র এবং অংশের এই আন্তঃসম্পর্ক রয়ে গেছে বিভিন্ন দেশের ভাষা, সংস্কৃতি ও পুরাণে। এবং তার মধ্যে রয়ে গেছে বাদ-প্রতিবাদও। বিভিন্ন সমাজের সাহিত্য, সংস্কৃতি, পুরাণের স্পষ্ট অর্থ উদ্ধার করতে হলে, এই-বাদ প্রতিবাদকে খণ্ডভাবে দেখলে হবে না। বাদ-প্রতিবাদকে দেখতে হবে খণ্ড বা অংশকে অতিক্রম করে সমগ্রের মধ্যে, অখণ্ডের মধ্যে।

সূত্র: ‘ভাষাতত্ত্বের আতশ কাঁচ এবং আধুনিক সাহিত্যে অর্থ‘, পিণ্টু দাস (পত্রিকা: আলাঘর, ডিসেম্বর, ২০১৯)।

মতামত জানান