ফাতু পাগলা

শুক্রবার মে ১, ২০২০ ০২:৪০

৪২ views

গ্রামের ছেলেরা তাকে ফাতুপাগলা বলে ক্ষ্যাপাতো। এই নামেরও একটা ইতিহাস আছে। সে কথা পরে বলি। দীনদার পিতা তার নাম রেখেছিল আল্লাহর নবীর নামে। নবী সোলেমান। দাউদ নবীর ছেলে সোলেমানও নবী ছিলেন। জগদ্বিখ্যাত বাদশা। পৃথিবীর সকল প্রাণী, গাছ-গাছালি, এমনকী জীন-পরীরাও তার অনুগত ছিল। কহবাত আছে, বানোরা গ্রামের নবী সুলেমানেরও অনুগত পরী ছিল। কেউ কেউ দেখেছেও নাকি, সোলেমান পরীর সাথে নিশিরাতে পুকুরঘাটে বসে গল্প করে। চেনা-অচেনা নানা ফল-ফুল নিয়ে পরী আসে তার সাথে দেখা করতে।

সোলেমান বিবাহ করেনি। তার বিবাহ স্থির হয়েছিল রবি মুন্সীর সুন্দরী মেয়ে ফাতিহার সাথে। বিবাহের দিন কয়েকপূর্বে কলেরা হয়ে মারা গিয়েছিল ফাতিহা। এরপর আর সোলেমানের বিবাহ হয়ে উঠেনি। ফাতিহার মৃত্যুর পরেই পরী আসর করে সোলেমানকে। লোকের ধারণা, ফাতিহার আত্মা নাকি পরী হয়ে সোলেমানের সাথে দেখা করে। এই কারণে তার নাম হয়ে যায় ফাতুপাগলা। কৌতুহলী লোকেরা পরীর গল্প শুনতে চায় সোলেমানের কাছে, সোলেমান শুধু হাসে। কোন জবাব সে দেয় না।

সোলেমানের পিতার জমি-জমা দাউদ বাদশার সমান না থাকলেও একেবারে কম ছিল না। গ্রামের লোকেরা এই কারণে পাগল জেনেও সোলেমানকে কন্যাদান করতে চাইতেন। কিন্তু সোলেমান বিবাহে রাজী হয়নি কখনো।

গ্রামের দক্ষিণপাশে বড় জলাশয়ের পাশে সোলেমানের বাড়ি। বাড়ি ভরা গাছগাছালিতে পাখিরা নিরাপদ আস্তানা গেড়েছে। গ্রামের ছেলেরা সেই পাখির ছানা চুরি করতে হানা দেয় সোলেমানের বাড়িতে। এই কারণে সোলেমান ছেলেদের দেখলেই ধাওয়া করে। আর তারা সমস্বরে চিৎকার করতে থাকে—

ফাতুপাগলা সোলেমান
রাতে শোনে পরীর গান।

গ্রামের লোকেদের মধ্যে ফাতিহার বাবা ও মসজিদের ইমাম রবি মুন্সী, আর করিমের বৌ লাইলীর সাথেই দুচারটা কথা হয় সোলেমানের। এছাড়া কারো সাথে গল্প করার মতো সময় তার নেই। সারাদিন নিজের বাগানে পাখি আর গাছেদের সাথে কত কী সব গল্প করে বেড়ায় সে। কখনো সখনো রান্না করে, না হয় লাইলীর দেওয়া খাবার খায়। সোলেমানের চাচাত ভাই মনু মিয়া তাকে তোয়াজ করতে চায়, সোলেমান পাত্তা দেয় না। তারে দেখলেই লাঠি নিয়ে ধাওয়া করে।

সোলেমান আর লাইলীকে নিয়ে রসাত্মক গল্প ছড়াতে চেষ্টা করে মনু মিয়া, গ্রামের বুড়োদের কেউ কেউ এই গল্পে কান দেয়। মসজিদে জুমার নামাযের পরে বুড়োরা করিমকে ধরে বসে। সোলেমান পাগল মানুষ, করিম যেন তার বৌকে সামলে রাখে, না হয় তাকে একঘরে করা হবে। কম কথার মানুষ রবি মুন্সী রেগে যায়। সোলেমানকে তিনি পুত্রের মতো স্নেহ করেন। গ্রামের যুবকেরা মুন্সীর সাথে তাল মিলায়। মনু মিয়ার রসাত্মক গল্প চেষ্টা এখানেই থেমে যায়।

ভিন্নপথ ধরে মনু মিয়া। চেষ্টা করে যেভাবে হোক সোলেমানের মন জয় করতে হবে। তার মৃত্যুর পর চাচা সম্পত্তি যেন বেহাত না হতে পারে তাই সোলেমান থেকে লিখে নিতে হবে সব কিছু। ভালো কিছু রান্না হলে মনু মিয়া তার বৌকে পাঠায় সোলেমানের জন্য খাবার নিয়ে। সোলেমান সেসব খেলেও মনে মনে হাসে, মনু মিয়ার বৌকে বলে লাভ নাই ভাবি সাব। আমি কাউকে জমি লিখে দিবো না।

সোমবার রাতে লাইলী খাবার দিয়ে আসে সোলেমানকে। সোলেমান বলে, আর কত খাওয়াবি, তোর ঋণ কি শোধ দিতে পারবো?

লাইলী বলে, আপনার ঋণ কিসের ভাইজান? আমরাই তো আপনার কাছে ঋণী। আপনি জমিগুলো চাষ করতে না দিলে ছেলে-মেয়ে নিয়ে কোথায় যেতাম তারও তো ঠিক ছিল না। এতগুলো ছেলে-মেয়ে, কিভাবে যে পালতাম!

সোলেমান বলে— যা, যা। বেশি কথা শুনতে ভালো লাগে না। আমি পাগল মানুষ, জমি চাষ করতে পারি না বলেই তো তোমাদের দিয়েছি।

লাইলী কথা বাড়ায় না, জানে বেশি কথা বললে পাগলা ক্ষ্যাপে যাবে।

পরদিন সকাল বেলার নাস্তা নিয়ে এসে সোলেমানকে খুঁজে পায় না লাইলী। তার বুকের ভিতর ধড়ফড় করে উঠে। বিগত বিশ বছরে সোলেমানকে একবারও সে বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতে দেখেনি। মানুষটা গেল কই। সে তার স্বামীকে খবরটা জানায়। তার স্বামী এদিক সেদিক খোঁজ খবর করে, সোলেমানকে খুঁজে পাওয়া যায় না।

সোলেমান নিখোঁজ হওয়ার পর রাম-রাজত্ব কায়েম হয় তার বাগান বাড়িতে। এতদিন যেসব ছেলেদের সে তার বাগানে ঢুকতে দেয়নি, তারাই এখন বাগানে রাজত্ব করে বেড়ায়। ছানাহারা পাখিদের কিচির-মিচির বেড়ে যায়। বৃহস্পতিবার সকালে এই পাখিমারা ছেলের দল সোলেমানের পুকুরে কিছু একটা আবিষ্কার করে। কাকেরা হৈচৈ করছিল, কাক তাড়াতে গিয়েই তারা দেখে পচা গন্ধ বেরুচ্ছে আর পুকুর ঢাকা বিলাতিপানার বন ফুলে উঠেছে একজায়গায়। গন্ধটা যে সেখান থেকেই আসছে তা তারা নিশ্চিত। খবরটা গ্রামময় ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগেনি। দলবেঁধে গ্রামের নারী-পুরুষ এসেছে দেখার জন্য। পুলিশে খবর পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠিয়ে দেয়। রাতে জানাজা হয় সোলেমানের। রবি মুন্সী জানাজা পড়ান। সোলেমানের চাচাত ভাই মনু মিয়া গত একসপ্তাহ বাড়িতে ছিল না। সোলেমানের লাশ পাওয়া যাওয়ার খবর শুনে সেও এসে জানাজায় শরীক হয়। লাশ দাফনের পরে মনু মিয়া সোলেমানের ঘরের তালা ভেঙে দখল নেয়। আর যাই হোক, চাচাত ভাই হিসেবে সোলেমানের ওয়ারিশ তো সেই হবে।

শুক্রবারে জুমার নামাযের পর ইমাম সাহেব গ্রামের সবাইকে উপস্থিত থাকতে বলেন। সোলেমান মারা গেছেন খবর পেয়ে জেলা শহর থেকে একজন উকিল এসেছেন গ্রামের মানুষের সাথে দেখা করতে। মানুষ মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে থাকে তারা। আবার কোন আপদ! নামাজ শেষে ইমাম সাহেব উকিল সাহেবকে ডাকলেন। তিনি গিয়ে ইমামের পাশে দাঁড়ালেন। ব্যাগ থেকে একটা দলিল বের করলেন।

গ্রামের মানুষ হতবাক হয়ে গেছে। সোলেমান কবে এই কাজ করেছে? সে তার বসতবাড়িসহ সম্পত্তির আটআনা লাইলীকে দিয়ে গেছে, আর বাকী আটআনার চারআনা গ্রামের স্কুলে আর চার আনা মসজিদে দিয়ে গেছে।

মনু মিয়া চিৎকার করে উঠে, আমি এই দলিল মানি না, আমি কোর্টে যাবো। আমাকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার জন্যই এই মিথ্যা দলিল বানানো হয়েছে।

ইমাম আর উকিল সাহেব চলে গেলেন একসাথে। গ্রামের লোকেরা কেউ কেউ চলে গেলেও অনেকেই দলাদলিতে লিপ্ত হয়েছে। কেউ বলছে, সোলেমান ঠিকই করেছে। কেউ বলছে, মামলা করলে মনু মিয়া সম্পত্তি ফিরে পাবে।

(Visited 1 times, 1 visits today)
মতামত জানান