রূপা ও তার পুরুষেরা : এক

মঙ্গলবার মে ৫, ২০২০ ০৮:২৫

পাতাটি ৮৮৮ বার পড়া হয়েছে।

হাসপাতালের জরুরী বিভাগের বিছানায় পড়ে আছে অর্ধমৃত একজন লোক৷ এইমাত্র তাকে ভর্তি করা হয়েছে৷ মাথার লম্বা চুল ভিজে আছে তাজা রক্তে৷ পরনে কালো রঙের টিশার্ট৷ টিশার্টের বুকে সাদা ব্লকের লেখা Never Give Up রক্তে রাঙা হয়ে আছে৷

ডাক্তার এসেছেন, পরীক্ষা করে নার্সদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে গেছেন৷ শরীরে আঘাতের চিহ্ন বেশি নেই৷ বুকের বাম পাশে ধারালো অস্ত্রের কোপ৷ ফসকে গেছে বলে গভীরে পৌঁছায়নি, তবে লম্বা করে কেটে গেছে৷ পেটে ছুরি বসানো৷ মাথার ফেটেছে খানিকটা৷ আঘাত বেশি না হলেও প্রচুর রক্ত ক্ষরণের কারণে অজ্ঞান হয়ে গেছে৷ আরেকটু দেরী হলেই মারা যেত৷

পুলিশের দারোগা এসে দেখে গেছেন, হুশ ফিরেনি বলে তিনি কোন কথা বলতে পারেননি৷ ডাক্তারকে বলে গেছেন, হুশ ফিরলে যেন তাকে খবর দেওয়া হয়৷

* * *

ফোনটা এসেছিল আকাশের নাম্বার থেকেই৷ তার বাবা রিসিভ করে হ্যালো বলার পর অপরপ্রান্তে একজন অপরিচিত লোক জানালেন, জরুরী ভিত্তিতে কুমিল্লা মুন হসপিটালে আসুন৷ আপনার ছেলে গুরুতর অসুস্থ৷

চমকে উঠে— কী হয়েছে আমার ছেলের, আপনি কে? জানতে চাইলেন আকাশের বাবা৷

— ‘আমার পরিচয় জেনে কাজ নেই, তাড়াতাড়ি চলে আসুন৷’ বলে কেটে দিলো অপরপ্রান্ত থেকে৷

হন্তদন্ত হয়ে আকাশের বাবা তার ছোট ছেলে নীরবকে গিয়ে অজ্ঞাত কলের কথা জানালেন৷ এরপর পিতা-পুত্র দুজনেই ছুটলেন মুন হসপিটালের দিকে৷

গোবিন্দপুর হতে ঝাউতলার মুন হসপিটাল বেশি দূরে নয়৷ তারা যখন হাসপাতালে পৌঁছলেন, তখন আকাশকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে৷

হাসপাতালের অয়েটিং রুমে আকাশের বাবা, তার ছোট ভাই আর সেই লোকটি বসে আছেন যে আকাশের বাবাকে ফোন করেছিলেন৷

একজন মধ্যবয়সী লোক, নাম সুরুজ আলী৷ তিনি জানালেন, তার বাড়ির পাশেই একজন লোককে কয়েকটি ছেলে মারছিলো দেখে তার স্ত্রী তাকে ডেকে আনেন৷ তিনি সাথে সাথে পুলিশে ফোন করেছিলেন৷ কিন্তু বাংলাদেশের পুলিশ ফোন পেয়েই ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছাতে পারে না৷ সময় লাগে৷

ইতোমধ্যে আক্রমণকারীরা লোকটিকে মৃত মনে করে পালিয়ে যায়৷ উৎসুক লোকেরা ভিড় করে থাকে, কিন্তু কেউই আহত লোকটিকে হাসপাতালে নেওয়ার কথা মনেও করলো না৷

সুরুজ আলী এলাকার প্রভাবশালী লোক৷ সরকার দলের সাথে তার দহরমমহরম আছে৷ লোক হিসেবে মন্দ নন৷ তিনি ভিড় ঠেলে ভিতরে ডুকলেন, এরপর একটা ভ্যান ডেকে কয়েকজনের সাহায্য নিয়ে লোকটিকে হাসপাতালে পাঠালেন৷ বুদ্ধিমান লোক, ভ্যানে উঠানোর আগে আহত লোকটির পকেট থেকে মোবাইল ও মানিব্যাগ বের করে নিলেন৷ তিনি জানেন, পরে এসব পাওয়া যাবে না৷

তিনি হাসপাতালে ফোন করে দিলেন, তার ফোন না পেলে হাসপাতালে তাকে ভর্তি করাতো না৷ এই ধরনের রোগীদের সাধারণত বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় না৷

সুরুজ সাহেব মনে করেছিলেন, লোকটির মোবাইলে নিশ্চয় তার পরিচিত কারো নাম্বার থাকবে, তাই মোবাইল খুলতে চাইলেন৷ আকাশের মোবাইল ছিল ফিঙ্গার লক৷ তিনি খুলতে পারলেন না৷ ভাবলেন সিম খুলে অন্য মোবাইলে লাগালে কোন নাম্বার পেতেও পারেন৷ কিন্তু সিমে কোন নাম্বার রক্ষিত ছিল না৷ সুরুজ আলীর মেয়ে বুদ্ধি দিলেন৷— বাবা তুমি হাসপাতালে যাও, লোকটির আঙুল লাগিয়ে লক খুলতে পারবে৷

সুরুজ আলী তাড়াতাড়ি হাসপাতালে এলেন৷ ডাক্তারকে সব খুলে বললেন৷ এও বললেন, এই রোগী আমার৷ চিকিৎসা চালিয়ে যান, টাকা আমি দিবো৷

একজন নার্সের সহযোগিতায় প্রথমে ডান হাতের বৃদ্ধাঙুল দিয়ে লক খুলতে চাইলেন৷ হলো না৷ এরপর তর্জনী দিতেই লক খুলে গেলো৷ ডায়ালের তৃতীয় নাম্বারটিই ছিল বাবা নামে রক্ষিত৷ সুরুজ আলী সেই নাম্বারে ফোন করেই আকাশের বাবাকে হাসপাতালে আসতে বলেছিলেন৷

মোবাইল আর মানিব্যাগ আকাশের বাবার হাতে দিয়ে সুরুজ আলী বললেন, এইগুলো আপনার ছেলের৷ আমি এখন চলে যাবো৷ ডাক্তারকে বলে দিয়েছি, তারা চিকিৎসায় গাফিলতি করবে না৷ এরপরও কোন ঝামেলা হলে আমাকে ফোন করবেন৷ আমিও আবার আসার চেষ্টা করবো৷ — এরপর সুরুজ আলী চলে গেলেন৷

আকাশের বাবা তার স্ত্রীকে ফোন করলেন, আকাশের মা, তুমি একটু মুন হাসপাতালে আসবে?

স্বামীর কাঁপা কণ্ঠস্বরে আঁতকে উঠলেন তিনি৷ কী হয়েছে তোমার? হাসপাতালে কেন আসতে হবে?

— তেমন কিছু না৷ আমার ডান হাত ভেঙে গেছে, তুমি এসো প্লিজ৷ টাকা নিয়ে এসো বেশি করে৷ আলমিরাতে আমার এটিএম কার্ড আছে, নিয়ে এসো৷

— ঠিক আছে, আমি এখনি আসছি৷

নীরব তার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে৷ এই কি তার বাবা গফুর মিয়া? তিনি তো এমন নিঃশঙ্ক, শক্ত হৃদয়ের মানুষ ছিলেন না৷ নীরবের মনে পড়ে, — একবার তার পায়ে খেঁজুরের কাঁটা ফুটেছিল৷ বাবা স্থানীয় ফার্মাসিতে নিয়ে গেলেন৷ ডাক্তার যখন সামান্য মাংস কেটে কাঁটা বের করছিলেন, তখন ভয়ে বেহুশ হয়ে গিয়েছিলেন বাবা৷ তার কপাল ঘামে ভিজে গিয়েছিল৷ সেই দুর্বল চিত্তের বাবা আজ কী নির্ভীক অভিনয় করলেন মায়ের সাথে৷ বিস্ময়ে হতবাক নীরব বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে৷ বাবার অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল তখন৷

রুপা ও তার পুরুষেরা

মতামত জানান